মুক্তদেশ ডেস্ক: চীনের আমদানি ও রপ্তানি মেলা, যা ক্যান্টন ফেয়ার নামেও পরিচিত, এর ১৪০তম আসর দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজুতে ১৫ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। এতে ৩২ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে বলে শুক্রবার দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী মন্ত্রী ঝাং লি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত সাত দশকে ক্যান্টন ফেয়ার চীনের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় পরিণত হয়েছে। পণ্যের বৈচিত্র্য, ক্রেতার সংখ্যা এবং লেনদেনের পরিমাণ—সব দিক থেকেই এটি শীর্ষস্থানীয়।
২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে চীনের পণ্য বাণিজ্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩৪ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ৫ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) পৌঁছেছে। এ সময়ে রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ।
ঝাং বলেন, চলতি বছর চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যে উদ্ভাবন এবং কাঠামোগত উন্নয়নের প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে। ক্যান্টন ফেয়ারেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
তিনি জানান, মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১ হাজারের বেশি উচ্চমানের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে এমন কোম্পানিও আছে, যারা বিশেষায়িত ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ও স্বতন্ত্র পণ্য তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট উৎপাদন খাতে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে।
প্রায় ৬৪ শতাংশ প্রদর্শক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এ ছাড়া প্রদর্শিত পণ্যের মধ্যে নতুন পণ্যের অংশ হবে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং পরিবেশবান্ধব বা সবুজ পণ্যের অংশ ২৬ শতাংশ। উভয় ক্ষেত্রেই এটি রেকর্ড সর্বোচ্চ।
ঝাং বলেন, এবারের মেলায় পুরো প্রদর্শনী প্রক্রিয়ায় এআই ও বিগ ডেটার মতো প্রযুক্তি যুক্ত করে ডিজিটাল ও বুদ্ধিমান ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা হবে।
প্রথমবারের মতো মেলায় ২২টি স্মার্ট অ্যাপ্লিকেশন পরিস্থিতি এবং ১৬টি এআই অ্যাপ্লিকেশন চালু করা হবে। একই সঙ্গে এটি হবে চীনের প্রদর্শনী শিল্পের প্রথম মেলা, যেখানে পুরো প্রদর্শনী প্রাঙ্গণে প্রতিটি স্টল পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য নেভিগেশন সুবিধা এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর)-এর মাধ্যমে স্টলের তথ্য দেখার ব্যবস্থা থাকবে।
বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোও শুধু অর্ডার নেওয়া ও পণ্য বিক্রির পরিবর্তে ব্যবসায়িক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সেবার মান উন্নয়নের দিকে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ঝাং জানান, এবারের মেলায় ট্রেড সার্ভিসেস বিভাগে প্রথমবারের মতো উৎপাদক সেবার ১০টি শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ ইতোমধ্যে ‘পণ্য + সেবা’ ব্যবসায়িক মডেলে চলে গেছে।
এবারের মেলায় অংশ নিতে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি বিদেশি ক্রেতা প্রাক-নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। মেলা শুরুর তারিখ যত এগিয়ে আসবে, নিবন্ধনকারীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বছর ক্যান্টন ফেয়ারের ৭০তম বার্ষিকী। প্রথম আসরে মাত্র ৯ হাজার ৬০০ বর্গমিটার প্রদর্শনী এলাকা এবং ১ হাজার ২০০ জন ক্রেতা ছিল। বর্তমানে এর প্রদর্শনী এলাকা বেড়ে হয়েছে ১৫ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার, আর ক্রেতার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার।
মেলায় প্রদর্শিত পণ্যের পরিবর্তন চীনের শিল্প কাঠামোর বিবর্তনেরও প্রতিফলন ঘটায়। শুরুর দিকে কৃষিপণ্য ও বিশেষায়িত পণ্য, হস্তশিল্প, বস্ত্র এবং হালকা শিল্পপণ্য ছিল প্রধান আকর্ষণ। পরে যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক পণ্য গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ১৯৯৯ সালে অনুষ্ঠিত ৮৬তম আসরে প্রথমবারের মতো যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক পণ্য মেলার সবচেয়ে বড় পণ্য শ্রেণিতে পরিণত হয়।
বর্তমানে ক্যান্টন ফেয়ারে ভোক্তা ইলেকট্রনিকস থেকে শুরু করে নতুন ধরনের জ্বালানি সংরক্ষণ পণ্য, এম্বডিড ইন্টেলিজেন্স-ভিত্তিক পণ্য এবং স্মার্ট চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যন্ত প্রদর্শিত হয়। চীনে তৈরি অনেক অত্যাধুনিক পণ্যের প্রথম প্রদর্শনও হয় এই মেলায়।
চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও ক্যান্টন ফেয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।
ঝাং বলেন, ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত মেলার মাধ্যমে প্রতিবছর যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করা হতো, তা চীনের মোট রপ্তানির ৩০ শতাংশেরও বেশি ছিল। কোনো কোনো বছরে এই হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বর্তমানে ক্যান্টন ফেয়ারে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ শতাংশ। তবে এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির সাধারণ বাণিজ্যের মোট রপ্তানির ১৬ শতাংশ করে থাকে বলে ঝাং জানান।
ঝাং বলেন, শুধু অর্ডার পাওয়ার সুযোগই নয়, ক্যান্টন ফেয়ার বিশ্ববাজারের সর্বশেষ চাহিদা, ভোক্তাদের পছন্দ, শিল্পের প্রবণতা, পণ্যের মানদণ্ড এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পণ্যের ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য এক জায়গায় নিয়ে আসে।
