ফরিদা পারভীনের আলোকিত অধ্যায়
মহসীন কবির: ফরিদা পারভীনের আলোকিত অধ্যায় ছিল মূলত একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী লোকসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তাঁর লালনগীতি পরিবেশনা, যা তাঁকে “লালনকন্যা” বা “লালন সম্রাজ্ঞী” হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। তিনি ১৯৮৭ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার সহ সঙ্গীতে অবদানের জন্য বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন এবং তাঁর গুরু মোকছেদ আলী সাঁই-এর কাছ থেকে লালনগীতি শেখেন।
প্রাথমিক জীবন ও লালনগীতিতে প্রবেশ: ফরিদা পারভীনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। ১৯৬৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর পেশাদার সঙ্গীত জীবন শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে তিনি কুষ্টিয়ায় গুরু মোকছেদ আলী সাঁইয়ের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর হাত ধরে লালনগীতি পরিবেশনা শুরু করেন।
উত্তরাধিকার: ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে গেছে, যা বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। তাঁর এই দীর্ঘ ও আলোকিত সঙ্গীত জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে থাকবে।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বরেণ্য সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) এক শোকবার্তায় প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন।তিনি বলেন, কিংবদন্তিতুল্য লালনগীতি শিল্পী ফরিদা পারভীন নজরুলগীতি, দেশাত্মবোধক নানা ধরনের গান করলেও শ্রোতাদের কাছে ফরিদা পারভীনের পরিচিতি ‘লালনকন্যা’ হিসেবে। পাঁচ দশক ধরে তাঁর কণ্ঠে লালন সাঁইয়ের গান মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। তাঁর গান আমাদের সংস্কৃতির অন্তর্লীন দর্শন ও জীবনবোধকেও নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ফরিদা পারভীন। কিছুদিন ধরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছিল, সপ্তাহে দুই দিন তাঁকে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের অংশ হিসেবে ২ সেপ্টেম্বর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু ডায়ালাইসিসের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। তখন চিকিৎসক তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন। এর পর থেকে তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত বুধবার অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।অবশেষে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি চলে যান না–ফেরার দেশে।
বিশ্বদরবারেও তিনি লালন সাঁইয়ের বাণী ও সুরকে প্রচারের কাজে নিয়েজিত ছিলেন। জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও বহু দেশে লালনসংগীত পরিবেশন করেছেন। লালনসংগীতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। এর বাইরে ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন। লালনশিল্পী হিসেবেই সুপরিচিত হন, তাঁর কণ্ঠে বেশ কটি আধুনিক ও দেশের গান জনপ্রিয় হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তোমরা ভুলে গেছ মল্লিকাদির নাম’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ ইত্যাদি।
