মুক্তদেশ ডেস্ক: আইনের শাসন ও দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় হার্ডলাইনে সরকার। রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়; অপরাধীকে অপরাধী হিসেবে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নিজ দলের বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালীদেরও ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিএনপি ও সরকারি সূত্রে এমন খবর জানা গেছে।
গতকাল ফেনীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বলেছেন, তার সরকার সর্বশক্তি দিয়ে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে এবং দেশে পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধ্বংসকৃত আইনের শাসন পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করবে। তিনি বলেন, ‘এ দেশের জনগণ যখন বিএনপি সরকারের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তখন সরকার তার সর্বশক্তি দিয়ে ইনশাআল্লাহ সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।
বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর ছিল ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে গণমাধ্যমসহ সর্বত্র এই সফর ইতিবাচক বিশ্লেষণ হওয়ার কথা। সেই সময়ে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর-লুটপাট, মোহাম্মদপুরে বাড়ি দখলসহ বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটানো হয়।
এর মধ্যে তদন্তে রাড্ডার ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ তার ঘনিষ্ঠদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। এই ঘটনা বিরোধী দলগুলো সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ করে দেয়। ফলে একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে সরকারের জন্য। প্রকৃত তথ্য জানার পর গত বুধবার রাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ও যুবদল এবং ছাত্রদলের পশ্চিমের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি ১৪ জন নেতাকর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। সর্বশেষ গতকাল ফেরদৌসী আহমেদ তার পদত্যাগপত্র জাতীয় সংসদের স্পিকারের জমা দেন এবং পরবর্তী সময়ে তার সংরক্ষিত আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র সাত মাসের কিছু বেশি সময়ের মাথায় এ সিদ্ধান্তটি এলো, যা কোনো সংসদ সদস্যের আশপাশের মানুষের অসদাচরণের অভিযোগে একজন দায়িত্বরত এমপির বিরুদ্ধে নেওয়া এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, যে কোনো রাজনৈতিক দলে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুদ্ধি অভিযান বা রদবদল কিংবা পদত্যাগের নির্দেশ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি দলের নিয়মিত পুনর্গঠন প্রক্রিয়ারই অংশ। শৃঙ্খলা ভঙ্গের ব্যাপারে আপস না করার যে নীতি দল নিয়েছে, এটি তারই প্রতিফলন।
অন্যদিকে, রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর-লুটপাটেরও তদন্তও করে সরকার। সেখানে জামায়াতের একজন এমপির জামাতা এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ অন্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের এসব সিদ্ধান্তে বিএনপিসহ বিরোধীদের মাঝে একটি কঠোর সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। তা হচ্ছে— এমপি, মন্ত্রী এবং নীতিনির্ধারক নিজেদের কর্মকাণ্ড এবং তাদের আশপাশের মানুষের কার্যক্রমের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় বার্তা গেছে বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে। দলটির নেতারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের মূল বার্তা হলো— দলের বা সরকারের ভেতরে কোনো ব্যক্তির পদমর্যাদা যা-ই হোক না কেন, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিংবা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন যে কোনো কিছুর জন্য শাস্তিমূলক বা রাজনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, অপরাধের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং এই সিদ্ধান্ত সেটি স্পষ্ট করে দিয়েছে। অপরাধী দলের ভেতরের হোক বা বাইরের, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রিন্স আরও বলেন, আগামী দিনগুলোয় পরবর্তী পদক্ষেপের মাধ্যমেও একই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
বিএনপির এক নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথমে নিজের দল ও সরকারের ভেতরে এই বার্তা দিতে চান এবং তারপর অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে; যেন কেউ তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি বা দ্বিমুখীনীতি প্রয়োগের অভিযোগ তুলতে না পারে।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে কমিটি ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি আরও নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতাকেও পদ-পদবি থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলের জাতীয় কাউন্সিল টার্গেট করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করা এবং দলের নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই ‘শুদ্ধি অভিযান’ হচ্ছে।
তারা বলছেন, দলকে আগামী দিনের জন্য আরও গতিশীল এবং সুশৃঙ্খল করতেই হাইকমান্ডের নির্দেশ বার্তা। যদিও এই প্রক্রিয়াটির শুরুর ধরন তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে অনেকটাই অপ্রত্যাশিত ছিল। ফলে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে একটা ভীতি তৈরি হয়েছে, যে কোনো সময় যে কোনো নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থমকে যেতে পারে।
এদিকে বেশ কয়েকজন সিনিয়র ও মাঝারি সারির নেতাকে দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার না করে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে— এই নতুন কৌশলটি নেতাদের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। কারণ, বহিষ্কার করা হলে জনসমক্ষে একটা কারণ দর্শানোর সুযোগ থাকে, কিন্তু নিজ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি চেয়ারম্যানের এক উপদেষ্টা আমাদের সময়কে বলেন, ক্ষমতাসীন হওয়ার পরও যদি প্রতিনিয়ত কমিটি বিলুপ্তি ও পদত্যাগের মতো নির্দেশনা থাকে, তবে কর্মীদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে।
এ ছাড়া সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। কেন একটি কমিটি বিলুপ্ত করা হলো বা কেন একজন নেতাকে পদত্যাগ করতে বলা হলো— তার যৌক্তিক কারণ স্পষ্ট করা দরকার। তা না হলে এই অভ্যন্তরীণ আতঙ্ক দলকে শক্তিশালী করার চেয়ে উল্টো দুর্বল ও লক্ষ্যহীন করে তুলতে পারে।
বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আমাদের সময়কে বলেছেন, কমিটি বিলুপ্তি আর এমপির পদত্যাগ মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা তৈরি করেছে, তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। যদি দ্রুত এই আতঙ্ক দূর করে একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা না যায়, তবে দলের ভেতরে একধরনের নিষ্ক্রিয়তা ভর করতে পারে, যা আগামী দিনের যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, দলের ভেতরের কেউ কেউ বিশৃঙ্খলা করছেন; সবাই নয়। উচ্চাভিলাষী এসব নেতাকর্মীকে কঠোরহস্তে দমন করা হবে। কাউকে আমরা ছাড় দিচ্ছি না। প্রথম পর্যায়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের অভিযোগে মেজর (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের স্কুলশিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশে সসম্মানে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ তাকে বাসায় দিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে দিয়ে সবার জন্য একই মেসেজ যে, যত প্রভাবশালী হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে, বিশৃঙ্খলা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের সময়
