মুক্তদেশ ডেস্ক: দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে ঝুলে থাকার পর দিনাজপুরের ফুলবাড়ী হাউজিং এস্টেট (উপশহর) প্রকল্পটি অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘ চিঠিপত্র আদান-প্রদানের পর সম্প্রতি জমিটি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিগগিরই লটারির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দের কার্যক্রম শুরু করা হবে।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার ফুলবাড়ী উপজেলাকে মহকুমা (সাব-ডিভিশন) ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের লক্ষ্যে শহরের প্রাণকেন্দ্রে ১১ দশমিক ৬৯ একর জমি অধিগ্রহণ করে ‘উপশহর প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় মৃত সুলতান হোসেনের ১১২ শতাংশ, মৃত দেলোয়ার হোসেনের ৭৫ শতাংশসহ মৃত রহমতুল্লাহ, মৃত সিদ্দিক মিয়া, মৃত আ. জব্বার, মোন্নাফ কমিশনার, মৃত জুবু উদ্দিনসহ অনেকের কাছ থেকে মোট ১১ দশমিক ৬৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সে সময় জমির মূল্য বাবদ মালিকদের মোট ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৬০ টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল।
জমিদাতাদের স্বজনদের দাবি, অত্যন্ত কম মূল্যে—বিঘাপ্রতি মাত্র ১৪ হাজার টাকায়—এবং তাও কিস্তিতে জমি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল তাঁদের। বর্তমানে ওই এলাকার জমির মূল্য শতকপ্রতি ৪ থেকে ৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
১৯৮০ সালের দিকে ৯১টি প্লট, সড়ক ও বিদ্যুৎ-সংযোগের কাজ শুরু হলেও সরকার পরিবর্তনের পর ১৯৮৪ সালে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকায় প্রকল্প এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু জমি বেদখল হয়ে যায়, বৈদ্যুতিক খুঁটি মরিচা পড়ে নষ্ট হয় বা চুরি হয়ে যায় এবং সড়কগুলো ভেঙে পড়ে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নাজিম উদ্দিন মণ্ডল বলেন, “৪৬ বছরের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে ফুলবাড়ী হাউজিং এস্টেট এখন নতুন রূপ পাওয়ার অপেক্ষায়। কৃষিজমির অপচয় রোধ এবং আবাসন সংকট নিরসনে দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।”
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪৬ বছরে এই প্রায় ১২ একর জমিতে চাষাবাদ হলে আনুমানিক ৩ হাজার ৯৮ টন ধান উৎপাদন সম্ভব হতো, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পতিত পড়ে থাকায় এলাকাটি মাদকসেবী ও অপরাধীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছিল। বর্তমানে কিছু বেকার যুবক সেখানে ধান চাষ করছেন। তবে কর্তৃপক্ষ কাজ শুরু করলে তাঁরা জমি ছেড়ে দেবেন বলে জানিয়েছেন।
সাবেক পৌর মেয়র মাহমুদ আলম লিটন বলেন, পৌরসভার ভেতরে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা দীর্ঘ ৪৬ বছর অব্যবহৃত থাকা দুঃখজনক। জায়গার অভাবে পৌরসভা খেলার মাঠ, পার্ক, গরুর হাট কিংবা কাঁচাবাজার স্থাপন করতে পারেনি।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ খুরশিদ আলম মতি বলেন, ১৯৭৯ সালে তৎকালীন সরকার ফুলবাড়ীকে মহকুমা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় এবং উপশহর প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর তা থমকে যায়। তিনি দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দাবি জানান।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের দিনাজপুর ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল কুমার মণ্ডল জানান, জেলা প্রশাসন সম্প্রতি জমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। পুরো এলাকা জরিপ করে নকশা অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। কিছু সড়ক উঁচু করতে হবে। পরিকল্পনা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত প্লট নির্ধারণ করে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফুলবাড়ী উপশহর প্রকল্প বাস্তবায়নের এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
