মুক্তদেশ ডেস্ক: ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাঁটুন এবং নিজের পায়ের দিকে একটু খেয়াল করুন। বড়দিনের রাতে গ্রিঞ্চের মতো নিঃশব্দে পা টিপে না হাঁটলে, বেশ সম্ভাবনা আছে যে হাঁটার সময় আপনার গোড়ালিই প্রথম মাটিতে পড়ছে।
মানুষ এই গোড়ালি থেকে পায়ের পাতার সামনের অংশে ভর দেওয়ার অভ্যাসের প্রতি আশ্চর্যজনকভাবে অনুগত। প্রায় দুই বছর বয়স থেকেই আমরা নিয়মিতভাবে এভাবে হাঁটতে শুরু করি। কেন এমন হয়, তা জানার চেষ্টা বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে করে আসছেন।
এখন তাঁরা হয়তো এর একটি উত্তর পেয়েছেন: অন্যভাবে হাঁটতে গেলে অবাক করার মতো বেশি শক্তি খরচ হয়।
৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি গবেষণায় মানুষ ও শিম্পাঞ্জি কীভাবে হাঁটে, তা তুলনা করা হয়েছে। এ জন্য উচ্চগতির ক্যামেরা এবং মাটিতে পায়ের আঘাতের চাপ পরিমাপ করতে সক্ষম বিশেষ যন্ত্রযুক্ত একটি পথ ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটা মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপেই দেখা গেছে—গোড়ালি আগে মাটিতে পড়েছে। একটি পদক্ষেপও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
অন্যদিকে, শিম্পাঞ্জিরা তাদের পায়ের পাশের অংশ বা পায়ের পাতার সামনের অংশে ভর দিয়ে মাটিতে নামতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছে।
এরপর গবেষকেরা ১১ জন মানব অংশগ্রহণকারীকে ইচ্ছা করে অস্বাভাবিকভাবে হাঁটতে বলেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা ট্রেডমিলে প্রথমে স্বাভাবিকভাবে হাঁটেন। এরপর প্রতিটি পদক্ষেপে পায়ের সামনের অংশ আগে মাটিতে ফেলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময় একটি যন্ত্র তাঁদের শরীরে অক্সিজেন ব্যবহারের মাত্রা পরিমাপ করে।
ফলাফল?
পায়ের মাঝামাঝি অংশ আগে মাটিতে ফেলে হাঁটতে গেলে ২৬ থেকে ৪১ শতাংশ বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়।
তাহলে সবাই এভাবে হাঁটে না কেন?
কারণ গোড়ালি আগে মাটিতে ফেললে আঘাতের মাত্রা বেশি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পায়ের মাঝামাঝি অংশে ভর দিয়ে নামার তুলনায় গোড়ালি দিয়ে মাটিতে নামার সময় শরীরে চাপ পড়ার হার সর্বোচ্চ ১৬২ শতাংশ বেশি হতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, এই অতিরিক্ত আঘাতের কারণেই শিম্পাঞ্জিরা দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটার সময় গোড়ালি আগে মাটিতে ফেলতে তুলনামূলকভাবে এড়িয়ে চলে।
গবেষণার সহলেখক এবং নিউইয়র্ক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক নাথান থম্পসন বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ভাবুন, আপনি কড়কড়ে শব্দ করে এমন একটি কাঠের মেঝের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে হাঁটার চেষ্টা করছেন। আপনি স্বাভাবিকভাবেই পায়ের সামনের অংশে ভর দিয়ে হাঁটবেন। কারণ এতে মেঝেতে চাপ পড়ার হার কমে এবং কম শব্দ হয়।”
আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের জন্য বিষয়টি ছিল বেশ কঠিন এক সমঝোতা: কম আঘাতে মাটিতে নামবেন, কিন্তু তার জন্য বেশি শক্তি খরচ করবেন; নাকি গোড়ালি আগে মাটিতে ফেলে বেশি আঘাত সহ্য করবেন, তবে শক্তি বাঁচাবেন?
শেষ পর্যন্ত মানুষ এর একটি সমাধান খুঁজে নেয়। বিবর্তনের ধারায় আমাদের গোড়ালির হাড় তুলনামূলকভাবে মোটা এবং পায়ের নিচের অংশের অস্থিসন্ধিগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে এসব অঙ্গ হাঁটার সময় তৈরি হওয়া অতিরিক্ত চাপ ভালোভাবে সামলাতে পারে। এর মাধ্যমে আমরা শক্তি সাশ্রয়ী সেই হাঁটার ধরনও বজায় রাখতে সক্ষম হই।
এই শারীরিক পরিবর্তন হয়তো শিকার করা, খাবার সংগ্রহ করা এবং নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সময় মানুষকে আরও বেশি পথ অতিক্রম করতে সাহায্য করেছিল।
