মুক্তদেশ ডেস্ক: রদিনাজপুরে স্বল্প জীবনকালীন আমন ধানের জাত ব্রি-৭৫-এর ফসল কাটা ও মাড়াই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে প্রচলিত নবান্নের মৌসুমের অনেক আগেই ধান কাটা শেষ করার এবং জমি শীতকালীন ফসল চাষের উপযোগী করে তোলার আশা জেগেছে। আধুনিক কৃষি গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত নতুন এই জাতটি উচ্চ ফলন ও তুলনামূলক কম সময়ে পরিপক্ব হওয়ার বৈশিষ্ট্যের কারণে কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আফজাল হোসেন বলেন, কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সারা বছর জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে উচ্চ ফলনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ধানের জাত উদ্ভাবনে কৃষি গবেষকেরা কাজ করছেন। গত বছর দিনাজপুরে পরীক্ষামূলকভাবে ব্রি-৭৫ ধানের চাষ করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফলন পাওয়ায় এ বছর জাতটির চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী জেলা দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলার নির্বাচিত কৃষকদের মধ্যে সীমিত পরিমাণে বীজ বিতরণ করা হয়। চলতি বছর জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা স্বল্প জীবনকালীন আমন ধানের জাত চাষ করেছেন।
এ মৌসুমে ব্রি-৭৫ ধান কাটার প্রথম আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয় সম্প্রতি বিরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ী গ্রামে। সেখানে কৃষক মো. রাশিদুল ইসলাম তাঁর আমন ধান কাটা শুরু করেন। একই উপজেলার নিজপাড়া ইউনিয়নের প্রেমবাজার গ্রামেও কৃষক জ্যোতিষ রায়ের জমিতে ব্রি-৭৫ ধান কাটা শুরু হয়।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে স্বল্প জীবনকালীন ও উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনের ফলে কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে অগ্রহায়ণ মাসের সঙ্গে নবান্নের ধান কাটার উৎসবের সম্পর্ক রয়েছে। তবে এ বছর বিরগঞ্জে আশ্বিন মাসেই আগাম আমন ধান কাটার উপযোগী হয়ে উঠেছে।
আগাম ধান কাটার গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ, প্রচলিত আমন জাতের তুলনায় এসব ধান দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকেরা অনেক আগেই জমি অন্য ফসল চাষের জন্য প্রস্তুত করতে পারবেন।
বিরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শরিফুল ইসলাম বাসসকে জানান, উপজেলার দুটি গ্রামের দুই কৃষকের জমিতে স্বল্প জীবনকালীন আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি বছর বিরগঞ্জে প্রায় ১০ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে স্বল্প জীবনকালীন হাইব্রিড ধানের চাষ করা হয়েছে। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে বিনা-১৭, ব্রি-৭৫ ও ব্রি-৮৭। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বল্প জীবনকালীন এসব আমন ধান সাধারণত রোপণের ১১০ থেকে ১১২ দিনের মধ্যে কাটা যায়। তিনি বলেন, ‘আগাম জাতের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ আগামী এক মাসের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, এসব জাতের ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৫ দশমিক ২৪ থেকে ৫ দশমিক ৫ মেট্রিক টন। তবে ধান কাটার পরই কৃষকেরা সবচেয়ে বড় সুবিধা পেতে পারেন। স্বল্প জীবনকালীন আমন ধান তুলনামূলক দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকেরা শীতকালীন রবি মৌসুমের জন্য সময়মতো জমি প্রস্তুত করতে পারবেন। এতে আলু, সরিষা, ভুট্টা ও গমের মতো ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হবে।
কৃষকেরা ইতিমধ্যে কাটা আমন ধানের জমিতে রবি ফসল চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে যেসব জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে বছরে দুটি ফসল উৎপাদন করা হতো, সেসব জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, এ পদ্ধতির চাষ সম্প্রসারণ এবং কৃষিজমির আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দিনাজপুরে আগাম আমন ধান কাটা শুরু হওয়া উন্নত জাত উদ্ভাবনের সুফলের একটি উদাহরণ হয়ে উঠছে। এর মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের সময়কাল কমানো, জমির ব্যবহার দক্ষতা বাড়ানো এবং অতিরিক্ত রবি ফসল চাষের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে।
