মুক্তদেশ ডেস্ক: মানিকগঞ্জের ঘিওর হাটে শালুকের স্তূপ সামনে নিয়ে বসে আছেন মালা বিশ্বাস, মায়া বিশ্বাস ও ঊর্মিলা বিশ্বাস। তিনজনই নৃ-জনগোষ্ঠীর নারী। পাশে রাখা দাঁড়িপাল্লা। প্রত্যেকের চটের বস্তায় ২৫ থেকে ৩০ কেজি শালুক। চার-পাঁচ দিন ধরে খাল-বিল, নালা ও জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহ করে এনেছেন তাঁরা। সেই শালুক বিক্রির আয় দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করছেন সংসারের খরচ। প্রতি কেজি শালুক বিক্রি করছেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়।
তাঁরা জানান, সাধারণ শালুকের দাম কেজিপ্রতি ১০০ টাকা। আর সিন্ধি শালুক বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। স্বাদে ভালো হওয়ায় সিন্ধি শালুকের চাহিদাও রয়েছে। তবে শালুক সংগ্রহ ও বিক্রি তাঁদের সারা বছরের পেশা নয়; এটি মৌসুমি কাজ। বছরের অন্য সময় জীবিকার তাগিদে করতে হয় নানা ধরনের শ্রমের কাজ। অনিশ্চিত আয়ের মধ্যেই কাটে তাঁদের জীবন।
সম্প্রতি মানিকগঞ্জের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ঘিওর হাটে কথা হয় শালুক বিক্রেতা এই তিন নারীর সঙ্গে। তাঁদের বাড়ি ঘিওর উপজেলার পয়লা ইউনিয়নের তেরশ্রী-সিধুনগর গ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে এ গ্রামে বসবাস করছে আদিবাসী নৃ-জনগোষ্ঠীর মানুষ। ঘিওর সদর ইউনিয়নের গোলাপনগর-কুঠিবাড়ি এলাকাতেও রয়েছে তাঁদের বসতি। এ ছাড়া উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় স্বল্প পরিসরে এই সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আসছে।
জলাশয় থেকে হাটে, কয়েক দিনের পরিশ্রম
বর্ষার শেষ দিকে শুরু হয় শালুক সংগ্রহের মৌসুম। মালা বিশ্বাসরা জানান, বুধবারের সাপ্তাহিক হাটগুলোকে সামনে রেখে চার-পাঁচ দিন ধরে শালুক সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। এ জন্য যেতে হয়েছে বানিয়াজুরী ইউনিয়নের খালাঞ্চলে, নালী ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয়ে এবং পাশের দৌলতপুর উপজেলার বরুরিয়া-বড়বিলাসহ বিভিন্ন খাল-বিলে। জলাশয় থেকে শালুক সংগ্রহ, বাছাই এবং বস্তায় ভরে হাটে নিয়ে আসা—সব মিলিয়ে কয়েক দিনের পরিশ্রম। মালা বিশ্বাস বলেন, ‘শালুক বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের প্রয়োজন মেটাই। আমাদের জন্য এটা ব্যবসা নয়, বেঁচে থাকার চেষ্টা।’
এক হাট থেকে আরেক হাটে :
ঘিওর হাটে বুধবার শালুক বিক্রির পর বৃহস্পতিবার যেতে হয় বরংগাইল হাটে। সেখানে সপ্তাহে দুই দিন—বৃহস্পতি ও সোমবার—হাট বসে। এ ছাড়া ঘিওর বাসস্ট্যান্ড, বানিয়াজুরী বাসস্ট্যান্ড এবং মানিকগঞ্জ জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ড ও কাঁচাবাজারেও শালুক নিয়ে বসেন তাঁরা।
এই তিন নারীর মতো অন্য শালুক সংগ্রহকারীরাও জানান, সাধারণত দুই থেকে তিন মাস থাকে শালুকের মৌসুম। কেউ ভোরে, কেউ দিনের শুরুতে জলাশয়ে নেমে শালুক সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি অনেকে ধরেন কুঁচো মাছ। এরপর সংগৃহীত শালুক ও মাছ নিয়ে ছুটতে হয় হাট-বাজারে।
তাঁদের ভাষ্য, শালুক সংগ্রহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই আদিবাসী নৃ-জনগোষ্ঠীর। তাঁদের অনেকেরই নিজস্ব জমি নেই। কেউ খাসজমিতে, কেউ অন্যের আশ্রয়ে বসবাস করেন। শালুকের মৌসুম শেষ হলে বদলে যায় জীবিকার ধরন। কেউ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে অন্যের বাড়িতে শ্রম দেন। কেউ অফিস-আদালত বা বাসাবাড়িতে বিভিন্ন কাজ করেন। আবার কেউ গরু, ছাগল কিংবা ভেড়া চরিয়ে আয় করেন।
দুই-তিন মাসের আয়ে চলে না সারা বছর
শালুক সংগ্রহের দুই-তিন মাস কিছু পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। এই আয় দিয়ে দৈনন্দিন খাবার, পোশাক ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানোর চেষ্টা করেন তাঁরা। তবে মৌসুমি এই আয় দিয়ে সারা বছরের প্রয়োজন মেটানো কঠিন। শালুকের মৌসুম শেষ হলে আবার নির্ভর করতে হয় অনিশ্চিত আয়ের অন্য কাজের ওপর। শালুক সংগ্রহকারীদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষও রয়েছেন। দীর্ঘ সময় পানিতে নেমে শালুক সংগ্রহ করা বেশ পরিশ্রমসাধ্য কাজ। এতে অনেকের হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে চুলকানি, চর্মরোগ ও অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দেয় বলে জানান তাঁরা।
কয়েকজন সংগ্রহকারী বলেন, তাঁদের পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শাপলা-শালুক সংগ্রহ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের চল রয়েছে। জলাশয় থেকে খাবার সংগ্রহ করে তা বিক্রির মাধ্যমে আয় করা এখনো তাঁদের কয়েকটি পরিবারের জীবিকার অংশ। তবে সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের কারণে তাঁরা সরকারি সহায়তা চান।
কয়েকজনের অভিযোগ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁরা সব সময় পর্যাপ্ত তথ্য পান না। ফলে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাঁদের দাবি, স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নিয়মিত খোঁজখবর নিলে এবং যাচাই-বাছাই করে যোগ্য ব্যক্তিদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে তাঁদের জীবনযাপনের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
শালুক শুধু খাবার নয়
গ্রামবাংলার পরিচিত জলজ উদ্ভিদ শাপলার কন্দজাতীয় অংশ শালুক নামে পরিচিত। বাংলাদেশে সাদা ও লাল শাপলার শালুক বেশি দেখা যায়। কিছু এলাকায় নীল শাপলার শালুকও পাওয়া যায়। স্বাদ ও জনপ্রিয়তার কারণে সাদা শাপলার শালুকের চাহিদা বেশি।
শালুক কাঁচা, সেদ্ধ কিংবা পুড়িয়ে খাওয়া যায়। খোসা ছাড়িয়ে মাছ, শুঁটকি বা অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে রান্না করেও খাওয়া হয়। গ্রামীণ এলাকায় অনেকে এটি আলু বা মিষ্টি আলুর বিকল্প হিসেবেও গ্রহণ করেন। শালুকে শর্করা, কিছু প্রোটিন, আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। ফলে এটি শুধু মৌসুমি খাবার নয়, গ্রামীণ জীবনে পুষ্টির একটি স্থানীয় উৎসও।
তবে শালুকের মৌসুমে কয়েক মাসের পরিশ্রম করে যে আয় হয়, তা দিয়ে সারা বছরের জীবিকা নিশ্চিত করতে পারেন না সংগ্রহকারীরা। জলাশয় থেকে শালুক তুলে হাটে বিক্রির এই শ্রমনির্ভর জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক ঐতিহ্য। কিন্তু মৌসুমি আয়ের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে স্থিতিশীল জীবন গড়তে তাঁদের প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা।
