মুক্তদেশ ডেস্ক: পাঁচ বিঘা জমির বাগানে শোভা পাচ্ছে কফি, রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ফল ও প্যাশন ফ্রুটসহ নানা জাতের ফলগাছ। এসব ফল বিক্রি করে বছরে খরচ বাদে আয় করছেন সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা। প্রায় পাঁচ বিঘা জমির বাগানের তিন বিঘায় রয়েছে কফির গাছ। বাকি দুই বিঘায় চাষ হচ্ছে রামবুটান, ড্রাগন ফল, প্যাশন ফ্রুট, কোকোসহ বিভিন্ন ফল।নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার এই নারী এখন এলাকার একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা খাদিজা আক্তর। জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের শৌলমারী সুনগর গ্রামে তার বাড়ি। ২০১৪ সালে হৃদ্রোগসহ নানা জটিলতায় স্বামী নজরুল ইসলামের মৃত্যু হলে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েন তিনি। তখন বড় ছেলে মো. আখতারুজ্জামান অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, আর ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়তেন। দুই ছেলের পড়াশোনা, সংসারের খরচ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়লেও হাল ছাড়েননি খাদিজা।
স্বামীর রেখে যাওয়া স্থানীয় কৈমারী বাজারের স্টেশনারি ব্যবসা সামলানোর পাশাপাশি জমির দেখাশোনা শুরু করেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের মাধ্যমে একদিকে সংসার চালিয়েছেন, অন্যদিকে সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। সম্প্রতি নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে খাদিজা বলেন, এত কষ্ট করতে হবে, তা আগে কখনো ভাবিনি। এখন পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, কীভাবে এত কিছু করেছি। সংসার, সন্তান আর ব্যবসা—সবই আমাকে একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে।
স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়াই ছিল খাদিজার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, আমার স্বামী মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ছেলেদের নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন পূরণে বড় ছেলে মো. আখতারুজ্জামানকে নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাতকে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অনুষদে মাস্টার্স সম্পন্ন করিয়েছি। ছেলেদের উচ্চশিক্ষিত করতে পেরেছি—এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।
বর্তমানে বড় ছেলে আখতারুজ্জামান একটি বেভারেজ কোম্পানিতে জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। ছোট ছেলে সেফায়েত ২০২৫ সালে মাস্টার্স শেষ করার পর চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি মায়ের বাগানের কাজে সহযোগিতা করছেন।
সন্তানদের মানুষ করার পাশাপাশি কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের পরিচিতিও গড়ে তুলেছেন খাদিজা। পেয়েছেন একাধিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার। তবে এই পথ সহজ ছিল না। স্বামীর ব্যবসা পরিচালনা এবং ফলের বাগান গড়ে তোলার সময় নানা কটূক্তি শুনতে হয়েছে তাঁকে। তবু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন।
২০১৮ সালে কৃষিতে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেন খাদিজা। কফি তাঁর পছন্দের পানীয়। বড় ছেলের পরামর্শে বাড়ির পাশের পতিত জমি পরিষ্কার করে সেখানে কফি চাষ শুরু করেন। পাশের কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে অ্যারাবিকা জাতের কফির চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন বাগানে।
এরপর ধীরে ধীরে বাগানে যুক্ত করেন রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ফল ও প্যাশন ফ্রুটসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের গাছ। কয়েক বছরের পরিচর্যায় গাছগুলোতে ফল আসতে শুরু করে। ফল চাষের পাশাপাশি শুরু করেন রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনও।
খাদিজা বলেন, একদিকে স্বামীর ব্যবসা, অন্যদিকে আমার বাগান করা। এ নিয়ে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে। বাগান করার সময়েও অনেকে নানা কথা বলেছে। কিন্তু কখনো আমি পেছনে ফিরে তাকাইনি।
বাগানে ঢুকতেই চোখে পড়ে নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফলগাছ। বাড়ির প্রবেশপথে মাচাজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্যাশন ফ্রুটের লতা। এক পাশে পুকুর, অন্য পাশে ফলের বাগান। বাড়ির আঙিনায় রয়েছে আম, লিচু, তেঁতুল ও তেজপাতাসহ বিভিন্ন গাছ। পাশাপাশি রয়েছে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনের ব্যবস্থা।
খাদিজা জানান, বাগান করার কয়েক বছরের মধ্যেই ফলন পেতে শুরু করেন তিনি। প্রায় ছয় বছর ধরে কফি বাজারজাত করছেন। গত বছর প্রতি কেজি এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দরে প্রায় ৪০০ কেজি রামবুটান বিক্রি করেছেন। চলতি বছর তিনটি গাছ থেকে পেয়েছেন প্রায় ৮০ কেজি রামবুটান।
তিনি বলেন, বাগান থেকে প্রতিবছর খরচ বাদে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় হয়। কফি প্রতি কেজি দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন। এ ছাড়া চলতি বছর রঙিন মাছের পোনা বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
শুধু ফল উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি খাদিজা। নিজের বাগানকে ঘিরে গড়ে তুলেছেন নার্সারিও। সেখানে রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি কফির চারা, ৩০০টি রামবুটানের চারা ও ২০০টি কোকো ফলের চারা। অনলাইনের মাধ্যমে এসব চারা বিক্রি করছেন তিনি।
এ কাজে মাকে সহযোগিতা করছেন কৃষিবিদ ছোট ছেলে সেফায়েত নামরাত। তিনি গণ বলেন, ‘অবসর সময়ে মায়ের সঙ্গে বাগানের পরিচর্যা এবং অনলাইনে ফল ও চারা বিক্রির কাজে সহযোগিতা করছি। ভবিষ্যতে আমাদের বাগান আরও সম্প্রসারণ করতে চাই।’
কৃষির আয় থেকে ইতিমধ্যে ৭৫ শতাংশ জমিও কিনেছেন খাদিজা। চলতি বছর জেলার সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তার পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এর আগে ২০২২ সালে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনের জন্য সম্মাননা পান।
পতিত জমিতে ফল চাষের আহ্বান
নিজের সাফল্যকে অন্য নারীদের জন্যও সম্ভাবনার পথ হিসেবে দেখেন খাদিজা। তাঁর মতে, ফল চাষের জন্য বড় জমি কিংবা বড় বিনিয়োগ সব সময় প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আশপাশের অব্যবহৃত জমিতেও ফলের গাছ লাগিয়ে পরিবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
খাদিজা আক্তার বলেন, ‘আমি চাই, আমার মতো যেন নারীরা এগিয়ে আসতে পারেন। বাণিজ্যিকভাবে না হলেও বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে ফলের গাছ লাগিয়ে অন্তত তাঁরা যেন পরিবারের ফলের চাহিদা পূরণ করতে পারেন।’
কৈমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাদেকুল সিদ্দিক বলেন, খাদিজা আক্তার একজন সংগ্রামী নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একাই সংসার, ব্যবসা ও সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব সামলেছেন। এখন তিনি একজন সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা। তাঁকে দেখে গ্রামের অনেকেই বাড়িতে দেশি-বিদেশি ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন, কৃষির প্রতি খাদিজা আক্তারের আগ্রহই তাঁকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পরামর্শ, উপকরণ, চারা ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সহযোগিতা করেছে। তাঁকে দেখে এলাকার অন্য নারী ও পুরুষেরাও কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর একা হাতে সংসারের দায়িত্ব সামলানো থেকে শুরু করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করা, ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এবং বিদেশি ফলের বাগান গড়ে তোলা—প্রতিটি ধাপেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন খাদিজা আক্তার। তাঁর পাঁচ বিঘার বাগান এখন শুধু আয়ের উৎস নয়, বরং প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার এক বাস্তব উদাহরণ। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, উদ্যোগ, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে কৃষিও নারীর আত্মনির্ভরতার শক্তিশালী পথ হয়ে উঠতে পারে।
