মুক্তদেশ ডেস্ক: রেকর্ডের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনো আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির প্রস্তুতিতে এশিয়ার সরকারগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। চরম তাপ, অতিবৃষ্টি ও খাদ্যসংকট একই সময়ে আঘাত হানতে পারে—এমন আশঙ্কায় অঞ্চলটির কয়েক শ কোটি মানুষ সম্ভাব্য একাধিক সংকটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রের পানির অস্বাভাবিক উষ্ণতার কারণে এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে। একই সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু সংকটও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে চলতি বছরের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালজুড়ে এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নেবে—এমন আশঙ্কা প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, এই অস্বাভাবিক শক্তিশালী আবহাওয়া ব্যবস্থার কারণে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চলতি মাসে বলেছেন, আমাদের চোখের সামনেই এল নিনো ‘সুপারসাইজড’ বা অস্বাভাবিকভাবে বড় ও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সূত্র :গার্ডিয়ান
এল নিনোর জন্য প্রস্তুতি নিতে এশিয়ার দেশগুলো কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা তুলে ধরা হলো—
চীনে ‘জলবায়ু ঝুঁকির মানচিত্র’
হংকংয়ে গত ৯ আগস্ট রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রার পর কর্তৃপক্ষকে কর্মক্ষেত্রের নীতিমালা সংশোধন করতে হয়েছে। প্রচণ্ড তাপমাত্রার সময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মীদের কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, শীতল রাখার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বিশ্রামের বিরতির ব্যবস্থা করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রচণ্ড গরমের সময় কর্মীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হংকংয়ের নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে এমনকি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
চীনের মূল ভূখণ্ডে চরম আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুতি এবং খরা ও অতিবৃষ্টির বিপরীত দুই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যেও ফসল রক্ষার লক্ষ্যে ১০০ দিনের একটি বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে।
বেইজিং আগাম সতর্কতা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। জুলাই মাসে দেশটি একটি জাতীয় পরিকল্পনাও চালু করেছে। এর আওতায় শহরগুলোকে ‘জলবায়ু ঝুঁকির মানচিত্র’ তৈরি করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এসব মানচিত্রের মাধ্যমে বন্যা ও তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো চিহ্নিত করা যাবে।
চরম আবহাওয়াকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে দেখছে তাইওয়ান
তাইওয়ানও সম্ভাব্য চরম আবহাওয়াকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করছে। দেশটি সন্ত্রাসী হামলা বা ভূমিকম্পের মতো জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতির জন্য যে ধরনের মহড়া চালায়, অনেকটা একই পদ্ধতিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে তাইওয়ানে টানা তিন দিন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার একটি পরিস্থিতি ধরে বড় ধরনের মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে শত শত মানুষ অংশ নেন। মহড়ায় বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, রেল যোগাযোগে সমস্যা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র অচল হয়ে যাওয়া এবং ব্যাপক হিটস্ট্রোকের মতো পরিস্থিতি অনুকরণ করা হয়।
সরকার তার ‘কুল ম্যাপ’ নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মটিও পরীক্ষা করছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ও তুলনামূলক ঠান্ডা জায়গায় যাওয়ার পথনির্দেশ দেওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রক্রিয়াজাতের পরিকল্পনা
দক্ষিণ এশিয়ায় এরই মধ্যে এল নিনোর ব্যাপক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ভারতের কিছু এলাকায় সেপ্টেম্বরে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ঘাটতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর প্রভাব পড়ছে ধান, ডাল, তুলা ও ভুট্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের ওপর।
আগামী কয়েক মাসে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এর ফলে খাদ্যের দাম আরও বাড়তে পারে, যা এরই মধ্যে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
ভারত সরকার কৃষকদের সুরক্ষায় অত্যন্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটির কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এটিকে কৃষকদের জন্য একটি ‘সুরক্ষা বলয়’ তৈরির উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দেশটির ৩৫০টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো ও পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকদের কম পানি প্রয়োজন হয় এবং দ্রুত ফলন পাওয়া যায়—এমন ফসল, যেমন ডাল ও মিলেটজাতীয় শস্য চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবে এই অঞ্চলে এল নিনোর সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে শ্রীলঙ্কায়। বৃষ্টির অনুপস্থিতি ও উচ্চ তাপমাত্রা এতটাই তীব্র হয়েছে যে দেশটি এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে পড়েছে। দেশটির ১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এখন পানীয় জলের সংকটে রয়েছেন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার শুকিয়ে গেছে।
কর্তৃপক্ষকে পর্যটকদের জন্য বিখ্যাত ইয়ালা জাতীয় উদ্যানের কিছু এলাকা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এই উদ্যান চিতাবাঘ, হাতি, কুমির ও চিত্রা হরিণের আবাসস্থল। প্রাণীগুলো যাতে পানির অভাবে মারা না যায়, সে জন্য ট্যাংকারে করে পানি এনে জলাশয়গুলো ভরাট করা হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুল্লাইথিভু লেগুনে মিঠা পানির অভাবে হাজার হাজার মাছ মারা গেছে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন মিঠা পানির সরবরাহ পুরোপুরি শেষ হয়ে যেতে পারে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, পানির উৎসগুলো শুকিয়ে গেলে পানি পাওয়ার আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে না।
এমন পরিস্থিতিতে কলম্বোকে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রক্রিয়াজাত করে পানযোগ্য করতে হবে। তবে দেশটির একমাত্র লবণাক্ত পানি শোধনাগারের ওপর নির্ভর করে এই চাহিদা পূরণ করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
