আহমেদ আল শেখ : ফাদার আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুর খবর যেদিন ঘোষণা করা হলো, সেদিন সকালে আমাকে আল জাজিরা এবং যে মানুষটির দূরদৃষ্টি এই প্রতিষ্ঠানকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল, তাঁকে নিয়ে লিখতে বলা হয়। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।
কোথা থেকে শুরু করব, তা নিয়ে আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম—ধারণাটির পেছনের মানুষ শেখ হামাদকে দিয়ে, নাকি আল জাজিরাকে দিয়ে? সত্যি বলতে, এই দুটিকে আলাদা করা কঠিন। প্রতিটি প্রকল্প প্রথমে একটি ধারণা হিসেবে জন্ম নেয়। এরপর এর পেছনে থাকা মানুষের দৃঢ় সংকল্প সেই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়। আল জাজিরা ছিল শেখ হামাদের মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁর দৃঢ়তা, অধ্যবসায় এবং নিজের অবস্থান ও সিদ্ধান্তের পক্ষে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানোর কারণেই এটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে—গণমাধ্যমের জগতে একটি শক্তি এবং এমন এক উপস্থিতি, যাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।
৩০ বছরেরও বেশি সময় পেছনে ফিরে তাকাই
অদ্ভুত এক কাকতালীয় ঘটনা। সেই একই সকালে বিবিসি ঘোষণা করেছিল, তারা তাদের আরবি টেলিভিশন সার্ভিস বন্ধ করে দিচ্ছে। সম্প্রচার শুরুর মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিউজরুমের দরজা আমাদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আবার কাজ খুঁজতে শুরু করলাম। আমার মতো একজনের জন্য, যিনি নিজের বাড়ি থেকে অনেক দূরে কাজ খুঁজতে অভ্যস্ত ছিলেন, পরিস্থিতিটি একেবারে অপরিচিত ছিল না। যদিও খবরটি এসেছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে।
এরপর এক সহকর্মী এসে জানালেন, লন্ডনে একটি কাতারি দল এমন সাংবাদিক নিয়োগ করছে, যারা কাতারে একটি নতুন টেলিভিশন নিউজ চ্যানেল চালু করতে যাচ্ছে। তিনি বললেন, চ্যানেলটি পশ্চিমা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর মতোই সংবাদকে তার গুরুত্ব অনুযায়ী স্বাধীনভাবে প্রচার করবে এবং টকশো সম্প্রচার করবে।
একটি আরব দেশে কি সত্যিই এমন কিছু সম্ভব?
এমন প্রশ্ন করতে হওয়াটাই ছিল দুঃখজনক।
আমি ১৫ বছর কুয়েতে বসবাস করেছি এবং ইরাকের আগ্রাসনের পর সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। উপসাগরীয় অঞ্চল আমার অনেক স্মৃতি বহন করে। আমার সন্তানদের জন্মও সেখানে। নতুন কাতারি প্রকল্পের কথা শুনে সেই স্মৃতিগুলো আবার মনে ভেসে উঠল। আর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—আগেও যেমন বহুবার করেছি, কাজ যেখানে নিয়ে যায়, সেখানেই যাব।
বিবিসি তার দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। আল জাজিরা খুলে দিয়েছিল তার দরজা।
১৯৯৬ সালের ১ জুন আমাদের বিমান দোহার পুরোনো বিমানবন্দরে অবতরণ করল। আমার সহকর্মী ও বন্ধু প্রয়াত আহমেদ আল-শৌলি স্যুট-টাই পরেছিলেন। বিমানের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে গরম বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইশ, তোমার মতো আমিও যদি হালকা হয়ে ভ্রমণ করতাম!”
নিউজরুমটি ছিল ছোট। তার পাশেই ছিল একটি ছোট স্টুডিও। পেছনে ছিল পাঁচটি ছোট এডিটিং কক্ষ, একটি টেপ লাইব্রেরি, প্রধান সম্পাদকের কার্যালয় এবং মহাপরিচালক ও তাঁর কর্মীদের জন্য একটি তুলনামূলক বড় অফিস।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, চ্যানেল চালুর ধারণাটি এর পেছনের মানুষটির মনে অনেক দিন ধরেই জায়গা করে নিয়েছিল। সাংবাদিক, প্রযুক্তিবিদ ও প্রশাসকদের নিয়োগ দিয়ে নিউজরুমে নিয়ে আসার আগেই এর ভিত্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এরপর তাঁরা নিজেদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সেই নিউজরুমকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন।
এটাও স্পষ্ট ছিল যে ভবনটির নকশা ও সরঞ্জাম যারা তৈরি করেছিলেন, তারা কল্পনাও করতে পারেননি চ্যানেলটি এত দ্রুত বড় হয়ে উঠবে। কয়েক বছরের মধ্যেই ভবনটি ছোট হয়ে গেল এবং সম্প্রসারণের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর সুযোগ-সুবিধাও আর যথেষ্ট থাকল না।
তবুও সেটি আমাদের সবার জন্য একটি উষ্ণ আশ্রয় ছিল। জায়গাটির ঘনিষ্ঠ পরিবেশ আমাদের আরও বেশি শক্তি ও দৃঢ়তা দিয়েছিল। আমরা এমন একটি চ্যানেল গড়ে তুলতে শুরু করলাম, যা আগের চ্যানেলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে গণমাধ্যমের ভারসাম্য বদলে দেবে।
পাঁচ মাসের পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের সময় দলটি প্রতিদিন আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠছিল। কিন্তু আমাদের সবার মনে একটি প্রশ্ন ছিল—আমাদের যে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা কি সত্যিই বাস্তব?
প্রতিটি নিউজ বুলেটিন শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই সংশয় ধীরে ধীরে দূর হতে লাগল। আমরা দেখলাম, সংবাদ, প্রতিবেদন কিংবা সংবাদ উপস্থাপনের ধরন—কোনোটিতেই কোনো হস্তক্ষেপ নেই।
কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াল অন্য কিছু। আমরা বিবিসির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভালো নিউজ বুলেটিন তৈরি করছিলাম; কিন্তু তখনো কোনো দর্শক তা দেখতে পাচ্ছিলেন না।
১৯৯৬ সালের ১ নভেম্বর আরব গণমাধ্যম অবশেষে তার কণ্ঠস্বর খুঁজে পেল। আল জাজিরার প্রথম সংবাদ বুলেটিনে প্রয়াত জামাল রাইয়ান বিশ্বের কাছে চ্যানেলটির যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেন।
যে মানুষটি আমাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি তাঁর কথা রেখেছিলেন। সেই বুলেটিনে তাঁর কোনো ছবি ছিল না। তাঁকে নিয়ে কোনো সংবাদও ছিল না।
আরব বিশ্বের মানুষ বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে তারা যে সংবাদ বুলেটিন ও টকশো দেখছে, সেগুলো একটি উপসাগরীয় আরব দেশ থেকে সম্প্রচারিত হচ্ছে।
তারা এমন টেলিভিশনেই অভ্যস্ত ছিল, যেখানে শাসকের প্রশংসা করা হতো এবং বাস্তবতার সাক্ষী হতে সাংবাদিকদের মাঠে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। মানুষের উদ্বেগ স্বাধীনভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল না। আনন্দ-বেদনা প্রকাশের জন্য মানুষকে নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার জায়গা দেওয়া হতো না। তাদের স্বপ্ন, দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতও প্রকাশ্যে বলার সুযোগ ছিল সীমিত।
এই ধারণা ও প্রকল্পের পেছনের মানুষটি এর অগ্রগতির দিকে গভীর নজর রাখতেন। তিনি আমাদের দেখতে আসতেন, সামগ্রিক দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ দিতেন এবং কখনো কখনো আমাদের সঙ্গে রসিকতাও করতেন। কিন্তু শেখ হামাদ কখনো কোনো সংবাদ প্রতিবেদন বা টকশোতে হস্তক্ষেপ করেননি। প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্ব যাদের দিয়েছিলেন, তারাও করেননি।
তিনি কথা দিয়েছিলেন এবং কথা রেখেছিলেন।
তখন আমরা বুঝেছিলাম, সাফল্য আমাদের হবেই।
তবে ক্যামেরাটি এবার একটু সামনে এগিয়ে নিই, যাতে খুব বেশি সময় পেছনে না থাকি।
কয়েক মাসের মধ্যেই অন্যরাও তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’ থেকে আসা নতুন এই চ্যানেলটির উপস্থিতি লক্ষ্য করতে শুরু করল। তারা আল জাজিরার প্রতিবেদন প্রচার করতে শুরু করল, কারণ আল জাজিরা ও এর সংবাদদাতারা এমন সব জায়গায় উপস্থিত ছিলেন, যেখানে অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো যেতে দ্বিধা করত।
ফিলিস্তিন, ইরাক ও আফগানিস্তানসহ গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের দুর্ভোগের ছবি একচেটিয়াভাবে আল জাজিরায় দেখা যেত। খুব দ্রুতই স্বীকৃতির বিষয়টি রূপ নিল এই স্বীকৃতিতে যে, আল জাজিরা নেতৃত্বের আসনে উঠে এসেছে।
সাফল্যের কারণে আরও বিস্তৃত দর্শকের কাছে পৌঁছানোর প্রয়োজন দেখা দিল। এরপর এলো আল জাজিরা ইংলিশ এবং নেটওয়ার্কের অনলাইন কার্যক্রম। এতে চ্যানেলটি এমন একটি নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হলো, যা উত্তর ও দক্ষিণ—পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে কথা বলত।
এটাই ছিল বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত।
দশকের পর দশক সংবাদ একদিকে প্রবাহিত হয়েছে। পশ্চিমা ক্যামেরা পশ্চিমা চোখে এবং পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বের ঘটনাগুলো ধারণ করেছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় ঔপনিবেশিক ও সাংস্কৃতিক পক্ষপাত দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে—কখনো তা ছিল স্পষ্ট, আবার কখনো কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকত।
গণমাধ্যমের সমীকরণ বদলে গেল।
এখন সংবাদ দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে প্রবাহিত হতে পারল—যে মানুষ ও স্থান থেকে সংবাদটি এসেছে, তাদের চোখ দিয়ে তা দেখা সম্ভব হলো।
বিশ্বজুড়ে নেটওয়ার্কটির ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও উপস্থিতি গ্লোবাল সাউথের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলেও পরিবর্তন আনল। এটি যে অঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই অঞ্চলসহ বৃহত্তর মুসলিম বিশ্ব এবং গ্লোবাল সাউথে নতুন সাংস্কৃতিক দিগন্ত উন্মোচন করল। এমনকি দূরবর্তী পশ্চিমেও এর প্রভাব পৌঁছাল।
কিন্তু বছরগুলো আমাদের শিখিয়েছে, সাফল্যের সঙ্গে বেদনাদায়ক পরিণতিও আসতে পারে। এর কিছু এসেছে আশপাশের অঞ্চল থেকে। আরও অনেক কিছু এসেছে বহুদূর থেকে।
আমাদের চারপাশের অঞ্চল স্বাধীন কণ্ঠস্বর এবং এর প্রভাব সহ্য করতে পারেনি। তাই তারা নিজেদের জন্য একজন শত্রু তৈরি করল। অফিস বন্ধ করে দেওয়া হলো। সংবাদদাতাদের হয়রানি করা হলো, গ্রেপ্তার করা হলো এবং হত্যা করা হলো। যে দেশটি এই নেটওয়ার্ককে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই দেশও তীব্র আক্রমণের মুখে পড়ল।
এটাই ছিল ‘আল জাজিরা সিনড্রোম’।
অঞ্চলের বাইরেও আল জাজিরার অফিসে বোমা হামলা হয়েছে। সাংবাদিক ও ক্যামেরা অপারেটররা নিহত, কারাবন্দি ও নির্যাতিত হয়েছেন। নেটওয়ার্কটির সদর দপ্তর যে দেশে, সেই দেশের ওপরও চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
শেখ হামাদ নতি স্বীকার করেননি।
নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাহসিকতায় তিনি তাঁর আশপাশের মানুষদের জিজ্ঞেস করতেন, “মুক্ত কণ্ঠস্বরকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা কখন বন্ধ করবেন?”
আর দূরের দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলতেন, “আপনারাই কি বছরের পর বছর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং মানুষের জানার অধিকার নিয়ে প্রচার করেননি?”
শেখ হামাদ ছিলেন নেটওয়ার্ক এবং সেখানে কর্মরত মানুষদের জন্য একটি ঢাল।
তিনি এবং আল জাজিরা পরিচালনার দায়িত্ব যাদের দিয়েছিলেন, তারা আমাদের বলতেন, “আপনাদের একমাত্র লাল রেখা হলো পেশাগত নীতিমালা। এর বাইরে আর কিছু নয়।”
ধারণা ও প্রকল্পটির পেছনের মানুষটির প্রতি আল্লাহ রহম করুন।
আমরা এখনো সেই পথেই এগিয়ে চলেছি।
লেখক : আল জাজিরা আরবির সাবেক প্রধান সম্পাদক
