মুক্তদেশ ডেস্ক: সুদানের যুদ্ধে পরিস্থিতি পরিবর্তনের কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (SAF) নর্থ কর্দোফান রাজ্যে ধারাবাহিকভাবে কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF) থেকে নতুন করে সদস্যরা পক্ষত্যাগ করছে। একই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নিচ্ছেন, যদিও তিনি জোর দিয়ে বলছেন, সামরিক অভিযান চলবে। আল জাজিরা
সেনাবাহিনীর অগ্রগতি আরএসএফের সরবরাহ লাইনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে এবং সদস্যদের পক্ষত্যাগ বাহিনীটির অভ্যন্তরীণ সংহতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে ট্রানজিশনাল সার্বভৌম কাউন্সিলের প্রধান আল-বুরহান যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তিশালী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার রূপরেখা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন।
তবে সামগ্রিক যুদ্ধক্ষেত্র এখনো বিতর্কিত। সামরিক চাপ, পক্ষত্যাগ ও রাজনৈতিক তৎপরতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হতে পারে। অর্থাৎ, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি হয়তো এখন সুদানের রাজনৈতিক ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।
সেনাবাহিনী কী অর্জন করেছে?
সাম্প্রতিক সবচেয়ে স্পষ্ট সাফল্য এসেছে মধ্য সুদানের নর্থ কর্দোফান রাজ্যে। এই অঞ্চল রাজধানী খার্তুমের সঙ্গে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সংযোগ তৈরি করেছে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে সেনাবাহিনী জানায়, তারা নর্থ কর্দোফানের বারা, জাবরা আল-শেখ ও উম্ম সায়ালাসহ বেশ কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখল করেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অগ্রগতির ফলে জাতীয় এক্সপোর্টস রোডের নিয়ন্ত্রণও সেনাবাহিনীর হাতে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি খার্তুম ও ওমদুরমান হয়ে নর্থ কর্দোফানের রাজধানী এল-ওবেইদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে।
এই সাফল্যের অর্থ এই নয় যে সেনাবাহিনী পুরো কর্দোফান অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। তবে দখল করা এলাকার বাইরেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
এক্সপোর্টস রোডের নিয়ন্ত্রণ নর্থ কর্দোফানে সেনাবাহিনীর অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং আরএসএফের সরবরাহ লাইনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ২১ আগস্ট আল-জাজিরা জানায়, কর্দোফান, দারফুর ও ব্লু নাইল অঞ্চলে লড়াই ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেও সেনাবাহিনী আরএসএফের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরএসএফের পক্ষত্যাগের অর্থ কী?
যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর চাপের সঙ্গে একই সময়ে আরএসএফ থেকে সদস্যদের পক্ষত্যাগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০ আগস্ট সেনাবাহিনী জানায়, চার কর্মকর্তাসহ প্রায় ৩১৮ জন তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। তারা প্রায় ৫০টি সামরিক যান নিয়ে নর্দার্ন স্টেটে পৌঁছান এবং পরে ওমদুরমানে যান।
এ ছাড়া কর্দোফান ও খার্তুম থেকে পৃথক কয়েকটি দলও সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এসব দলের মধ্যে প্রায় ২৭০ জনের একটি দল ছিল, যাদের মধ্যে ২১ জন ফিল্ড কমান্ডার ছিলেন। বারা এলাকা থেকেও ৪৫ জন যোদ্ধা ও কমান্ডার সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
তবে শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়ের প্রেক্ষাপট।
২১ আগস্টের আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়, আরএসএফ থেকে বাড়তে থাকা পক্ষত্যাগের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবর্তন, আরএসএফের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, সামাজিক ও গোত্রীয় নানা বিষয় এবং সেনাবাহিনীর অগ্রগতি ও আরএসএফের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা।
তবে এসব পক্ষত্যাগের অর্থ এই নয় যে আরএসএফ ভেঙে পড়ছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—বিশেষ করে আরও বেশি কমান্ডার ও যোদ্ধা যদি মনে করেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য আরএসএফের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে সতর্কভাবে বলা যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর চাপ হয়তো আরএসএফের অভ্যন্তরীণ সংহতিতে প্রভাব ফেলছে, কিন্তু তা এখনো সংগঠনটির বড় ধরনের ভাঙনের পর্যায়ে পৌঁছেনি।
আল-বুরহান কেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করছেন?
সেনাবাহিনীর প্রধানের রাজনৈতিক উদ্যোগটি সামরিক অগ্রগতির পাশাপাশি এগিয়ে চলছে।
১৫ আগস্ট আল-বুরহান ঘোষণা করেন, একটি স্বাধীন জাতীয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত জাতীয় সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের অস্থায়ী দায়মুক্তি এবং আইনি, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। সংলাপে অংশ নেওয়ার সময় যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে, তাদের বিচারপ্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। তবে যারা অভিযোগ করেছেন, তাদের অধিকার বাতিল করা হবে না।
আল-বুরহান বলেন, একদল সুদানি নাগরিক তার কাছে সংলাপের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। ওই দল স্বাধীনভাবে সংলাপ পরিচালনা করবে এবং রাষ্ট্র এর এজেন্ডা বা ফলাফল নির্ধারণ করবে না।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর সমর্থনকারী জাতীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে তিনি আলোচনা শুরু করেছেন। এর লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার কাজে তাদের সম্পৃক্ত করা, যার মধ্যে একটি আইন পরিষদ গঠনও রয়েছে।
তবে এর অর্থ যুদ্ধ থেকে সরে আসা নয়।
আল-বুরহান বলেন, তিনি এমন কোনো “অর্থহীন শান্তি” মেনে নেবেন না, যার মাধ্যমে আরএসএফের কমান্ডার মোহাম্মদ হামদান দাগালো—যিনি হেমেদতি নামেও পরিচিত—এবং তার সমর্থকেরা ক্ষমতায় আসতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, শান্তির পথ শুরু হবে আরএসএফের শহরগুলো থেকে সরে যাওয়া এবং নির্ধারিত এলাকায় তাদের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে।
২১ আগস্ট আল-জাজিরা জানায়, আল-বুরহান বলেছেন, তিনি যেটিকে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী আরএসএফের সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি এমন কোনো যুদ্ধবিরতিও প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা আরএসএফকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে। তবে তিনি ন্যায্য শান্তি ও জাতীয় সংলাপের ব্যাপারে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন—যে সংলাপে আরএসএফ থাকবে না।
অর্থাৎ, আল-বুরহান যুদ্ধ ও রাজনীতির মধ্যে একটিকে বেছে নিচ্ছেন না। তিনি দুটোই একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছেন—সামরিক চাপ বজায় রাখার পাশাপাশি এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করছেন, যা তার ভাষায় রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করবে।
মালিক আগারের অবস্থান কী নির্দেশ করে?
ট্রানজিশনাল সার্বভৌম কাউন্সিলের উপপ্রধান মালিক আগার সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন।
২২ আগস্ট আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আগার বলেন, গুরুতর আলোচনার পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান বিকল্প হলো সামরিক সমাধান। তার মতে, আলোচনা শুরুর আগে আরএসএফকে শহর ও আবাসিক এলাকা থেকে সরে যেতে হবে।
তিনি বলেন, সুদানের ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করে—এমন যেকোনো উদ্যোগের ব্যাপারে সরকার এখনো উন্মুক্ত।
২৩ আগস্ট প্রকাশিত আরেক সাক্ষাৎকারে আগার বলেন, সেনাবাহিনী যুদ্ধে জয়ী হবে, তবে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের অবসান হবে আলোচনার মাধ্যমে।
তার মতে, সুদানের সংকটের শিকড় আরও গভীরে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের দেশের জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য পরিচালনায় ব্যর্থতা।
তার অবস্থান সরকারের বৃহত্তর কৌশলকে প্রতিফলিত করে: যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক চাপ বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে শক্তিশালী অবস্থান থেকে আলোচনার দরজা খোলা রাখা।
আল-বুরহান কি যুদ্ধক্ষেত্রের চাপকে রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে কাজে লাগাতে পারবেন?
নর্থ কর্দোফানে সেনাবাহিনীর অগ্রগতি একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর তাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। একই সময়ে আরএসএফ থেকে বাড়তে থাকা পক্ষত্যাগ বাহিনীটির অভ্যন্তরীণ সংহতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
তবে আরএসএফ এখনো বিভিন্ন ফ্রন্টে সক্রিয় এবং সামগ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি এখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
এই তিনটি বিষয়—সামরিক অগ্রগতি, পক্ষত্যাগ এবং রাজনৈতিক উদ্যোগ—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে কেবল বিচ্ছিন্ন যুদ্ধ বা পক্ষত্যাগের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ দিচ্ছে না। পরিবর্তিত সামরিক ভারসাম্য হয়তো এখন সুদানের পরবর্তী রাজনৈতিক পর্যায়ের শর্ত নির্ধারণ করতেও শুরু করেছে।
আল-বুরহানের জন্য সম্ভাব্য সুবিধাটি শুধু ভূখণ্ড দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে এবং এর ফলে আরএসএফের সদস্যরা পক্ষত্যাগ করতে থাকলে, সেনাবাহিনী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কারা অংশ নেবে এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার শর্ত কী হবে—তা নির্ধারণে আরও বেশি সুযোগ পেতে পারে।
অন্যদিকে আরএসএফের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু ভূখণ্ড ধরে রাখা নয়। তাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে যুদ্ধক্ষেত্রের চাপকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকটে পরিণত হওয়া থেকে ঠেকানো।
তবে এখনো তেমন কিছু ঘটেনি। যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক বিপর্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো পক্ষকে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে দেয় না।
তাই সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক সাফল্যকে চূড়ান্ত বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় কীভাবে পরিচালিত হবে এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দিকে যাবে—সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
প্রশ্ন হলো, আরএসএফ কি পক্ষত্যাগের এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের দর-কষাকষির অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, নাকি অব্যাহত সামরিক চাপ আল-বুরহানকে সুদানের পরবর্তী রাজনৈতিক পর্যায়ে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেবে?
