মুক্তদেশ ডেস্ক: জুলাইয়ের শেষ দিকে ভারত সরকার যখন কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণা দেয়, তখন ব্যাপকভাবে উদ্যাপন করা হয়। বারবার পরীক্ষা বাতিল এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষোভ বাড়তে থাকায় সারা দেশের শিক্ষার্থীরা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নেতৃত্বাধীন গণবিক্ষোভে যোগ দিয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে পরীক্ষার চাপ আরও বেড়েছে। দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) প্রকাশিত Accidental Deaths and Suicides in India প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যা ২০১৪ সালের ৮,০৬৮টি থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৪,৪৮৮টিতে দাঁড়িয়েছে—অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি।
পারিবারিক সমস্যার পর পরীক্ষায় ব্যর্থতাকে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেসব পরিবার মনে করে, শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক নানা কেলেঙ্কারির কারণে তারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছে, তাদের কাছে টেলিভিশনে বিক্ষোভের দৃশ্য দেখা ছিল মিশ্র অনুভূতির বিষয়। কেউ খুশি যে ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীদের হয়তো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে না। আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—এত পরিবর্তন আসতে এত সময় লাগল কেন?
দ্য গার্ডিয়ান এমন চারটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছে। তারা কী ঘটেছিল এবং আজ তারা কী অনুভব করেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
অংশিকা পাণ্ডে, ২০, দিল্লি
অংশিকা ছিলেন যমজ দুই বোনের একজন এবং চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তার বাবা বলেন, পরিবারের মধ্যে অংশিকাই ছিলেন সবচেয়ে শান্ত, নীরব ও দায়িত্বশীল।
তার পড়ার বইগুলো এখনো সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে। যে জায়গায় শেষবার ব্যাগ ও পরিচয়পত্র ঝোলানো হয়েছিল, সেখানেই সেগুলো ঝুলছে।
অংশিকার স্বপ্ন ছিল নিজের এলাকার একজন চিকিৎসক হওয়া। একদিন তিনি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন ‘দরিদ্র মানুষের সেবা করতে’ চেয়েছিলেন।
অংশিকা প্রতিদিন ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পড়াশোনা করতেন। পাশাপাশি প্রায় ছয় ঘণ্টা একটি দোকানে খণ্ডকালীন কাজ করতেন। রাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না।
এ বছর চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তি হওয়ার জন্য ভারতের ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET) ছিল চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে তার তৃতীয় প্রচেষ্টা।
৩ মে পরীক্ষা দেওয়ার পর তিনি আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ১২ মে জানতে পারেন, টানা দ্বিতীয় বছরের মতো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এবং আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।
অংশিকার বাবা দিল্লির ক্যাবচালক ইন্দ্রধর পাণ্ডে বলেন, ‘অংশিকা ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। সে আশা করেছিল, এ বছরই কলেজে ভর্তি হবে এবং যে পরীক্ষা দিয়েছিল, সেটিও তার ভালো হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলে সে শুধু আফসোস করে বলছিল—সে কীভাবে আবার ভালো একটি পরীক্ষা দেওয়ার আশা করবে?’
বাইরে থেকে অংশিকা শান্তই ছিলেন। ঘরের কাজ করতেন এবং সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতেন।
কিন্তু দুই দিন পর, ১৪ মে, পরিবারের সবাই যখন কাজে চলে গিয়েছিলেন এবং তার যমজ বোন ও ছোট ভাই ঘুমাচ্ছিল, তখন অংশিকা আত্মহত্যা করেন।
অংশিকার স্বপ্ন ছিল, পরিবারের সদস্যদের—বিশেষ করে ভাইবোনদের—তারা যে বস্তিতে থাকত, সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসবেন।
তার ছোট বোন প্রগতি এখন সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চান। দুই বোন এ নিয়ে বহুবার কথা বলেছিলেন—সেসব কথাও তিনি এখন স্মরণ করেন।
বাড়ির দেয়ালে অংশিকার আঁকা ছবি, নিজেকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য লেখা ইতিবাচক বার্তা এবং মন্ত্রের মতো কিছু বাক্য এখন পরিবারের কাছে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি। পরিবার এসব স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
সুফি শাহীন, ১৯, দিল্লি
২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে সুফি শাহীন চুল ঠিক করে নিজের প্রিয় জিনস পরেছিলেন।
বের হওয়ার সময় তিনি মায়ের কাছে ১০ রুপি চেয়েছিলেন—অন্য দিনগুলোর মতো ১০০ রুপি নয়। এরপর তিনি JEE পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্লাসে যাওয়ার জন্য বের হন।
তার মা সুলতানা খাতুন মেয়েকে খালি পেটে কেন বের হচ্ছেন, তা জিজ্ঞেস করেন। শাহীন জানান, তিনি দ্রুতই ফিরে আসবেন।
কিন্তু ২০ মিনিট পর বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে একটি কোচিং সেন্টারের সপ্তম তলা থেকে তিনি লাফ দেন।
শাহীন মারা যাওয়ার প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। কিন্তু তার মা খাতুন এখনো সেই ঘটনা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি গুরুতর বিষণ্নতার চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং বারবার মাথাব্যথায় ভুগছেন।
মেয়ের স্কুলজীবনের ছবি দেখতে দেখতে খাতুন বলেন, ‘চার সন্তানের মধ্যে সে ছিল আমার একমাত্র মেয়ে এবং অনেকটা বন্ধুর মতো। আমি যখনই বাড়ির বাইরে যেতাম, সে আমাকে তৈরি হতে সাহায্য করত। পড়াশোনা এবং ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার বিষয়ে সে যেমন গভীরভাবে আগ্রহী ছিল, তেমনি সাজগোজও ভালোবাসত। বাড়ির সবাইকেও সে সাজতে উৎসাহ দিত।’
বাবা একজন কারিগরি প্রকৌশলী হিসেবে যে সামান্য আয় করতেন, তা দিয়ে বাবা-মা ও তিন ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন শাহীন।
তার মা বলেন, শাহীনের স্বপ্ন ছিল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া এবং ‘নিজের সম্প্রদায়ের ছেলেদের চেয়েও বেশি সাফল্য অর্জন করা।’
শাহীন দ্রুত শিখতে পারতেন এবং পড়াশোনায় অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। নিজে নিজেই ছবি আঁকা ও চিত্রাঙ্কন শিখেছিলেন। এমনকি জাপানি ও কোরিয়ান ভাষায় কথা বলাও শিখেছিলেন।
তবে কয়েক মাস ধরে তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় পর্যায়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয়বার অংশ নিয়ে পাস করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
ভারতের ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) যখন JEE পরীক্ষার পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনে, তখন শাহীন কয়েক দিন ঘুমাতে পারেননি।
তিনি মানসিক চাপে থাকতেন, ভাই ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় কাঁদতেন। বাবা-মায়ের উদ্দেশে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। সেখানে তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং ছোট ভাই মাসুমকে তাদের স্বপ্ন পূরণ করার অনুরোধ করেছিলেন।
