মুক্তদেশ ডেস্ক: ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে বাম পা হারানো এক জাপানি স্বেচ্ছাসেবক সেনা বলেছেন, বিদেশি যোদ্ধাদের অনেক সময় পর্যাপ্ত তথ্য বা প্রস্তুতি ছাড়াই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পাঠানো হতো। তবে চার বছর ধরে সম্মুখসমরে লড়াই করার পরও চিকিৎসা শেষ হলে তিনি আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে চান।
২০২৬ সালের মে মাসে ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের লভিভ অঞ্চলের একটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যথাযথ ব্রিফিং ছাড়াই তাঁকে বিপজ্জনক অভিযানে পাঠানো হয়েছিল।
“বিদেশিদের শুধু সম্মুখসারির ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যবহার করা হতো।”
ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটা এই সাবেক জাপান গ্রাউন্ড সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের সদস্য পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে মর্টারের গোলার স্প্লিন্টারের আঘাতে হাঁটুর নিচ থেকে বাম পা হারিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর ডান হাত ও পিঠেও গুরুতর আঘাত লেগেছে।
হালকা হাসি দিয়ে তিনি বলেন,
“এতদিন হাসপাতালে থাকার কারণে শরীরের অনেক শক্তি হারিয়ে ফেলেছি।”
তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করা অনেক সহযোদ্ধাই নিহত হয়েছেন। তবুও ইউক্রেনের “বিজয়” না হওয়া পর্যন্ত দেশটি ছাড়ার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই।
যুদ্ধের শুরু থেকেই যোগদান
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করার পর প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একটি বিদেশি লিজিয়ন (Foreign Legion) গঠন করেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাবেক সেনাসদস্যদের ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
ইউক্রেন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০টি দেশের ২০ হাজারের বেশি মানুষ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
জাপানি এই স্বেচ্ছাসেবক বলেন, সামরিক প্রশিক্ষণের প্রতি তাঁর আগ্রহ অনেক দিনের।
“অনেকে হয়তো আমাকে একটু পাগল ভাববে। কিন্তু ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই ছিল আমার জীবনের লক্ষ্য।”
রাশিয়ার আগ্রাসন তিনি মেনে নিতে পারেননি। প্রথমে জাপানে অবস্থিত ইউক্রেন দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদন করেন। যদিও জাপান সরকার ইউক্রেন সফর না করার পরামর্শ দেওয়ায় তিনি প্রথমে সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছা দমন করতে পারেননি।
২০২২ সালের মার্চে তিনি পোল্যান্ডে ইউক্রেন দূতাবাসে যান। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে ইউক্রেনে প্রবেশ করেন।
দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণের পর যুদ্ধ
মাত্র দুই সপ্তাহের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বিদেশি লিজিয়নে যোগ দেন এবং তীব্র যুদ্ধ চলা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলে মোতায়েন হন।
তাঁর মাসিক বেতন ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার হৃভনিয়া, যা প্রায় ৫ লাখ জাপানি ইয়েন (প্রায় ৩ হাজার মার্কিন ডলার)।
দ্রুত গঠিত এই ইউনিটে ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত বিদেশিদের পাশাপাশি এমন স্বেচ্ছাসেবকেরাও ছিলেন, যারা দৈনন্দিন জীবনে না পাওয়া রোমাঞ্চের খোঁজে যুদ্ধে এসেছিলেন।
“আমরা শেষ পর্যন্ত বহিরাগতই ছিলাম”
তিনি বলেন, ইউক্রেনের নিয়মিত সেনাবাহিনী খুব কম ক্ষেত্রেই বিদেশি যোদ্ধাদের বিস্তারিত অভিযানের পরিকল্পনা জানাত। ফলে কোথায় মাইন পাতা আছে তা না জেনেই রুশ বাহিনীর মুখোমুখি হতে হতো।
“দিন শেষে আমরা বহিরাগতই ছিলাম।”
তিনি স্মরণ করেন, একবার তাঁদের মাথার ওপর ক্লাস্টার বোমা বিস্ফোরিত হচ্ছিল। তিনি দ্রুত একটি সাঁজোয়া যানের নিচে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্প্লিন্টার এসে আঘাত হানে। তাঁর পাশের এক সেনার দুই চোখেই স্প্লিন্টার ঢুকে যায়।
স্নাইপার হিসেবে দায়িত্ব
সম্মুখসারিতে স্নাইপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পরে আটক করা রেডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, তাঁর গুলিতে দুই রুশ সেনা নিহত হয়েছিল।
তিনি বলেন,
“আমি কোনো মানসিক চাপ অনুভব করিনি। এটা ছিল শুধু আমার দায়িত্ব।”
তবে সহযোদ্ধাদের মৃত্যু তাঁকে ভিন্নভাবে নাড়া দিত।
ঘনিষ্ঠ এক জাপানি স্বেচ্ছাসেবক ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় লুহানস্কে মাথায় আঘাত পেয়ে নিহত হন। তিনি সেখানে পৌঁছানোর আগেই মরদেহটি কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল।
মানসিক চাপ সামলাতে তিনি গান শুনতেন।
যুদ্ধের ক্লান্তি
দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধ চলতে থাকায় টানা লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে অনেক বিদেশি স্বেচ্ছাসেবক ধীরে ধীরে ইউক্রেন ছেড়ে চলে যান।
২০২৫ সাল থেকে তিনি একটি নিয়মিত ড্রোন ইউনিটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গুরুতর আহত হলেও তাঁর সংকল্প বদলায়নি।
তিনি বলেন,
“সম্মুখসারির যুদ্ধ মানসিকভাবে খুবই ক্লান্তিকর। কিন্তু এখন জাপানের জীবন আমার কাছে খুব সাধারণ মনে হয়।”
চিকিৎসা শেষ হলেই তিনি আবার নিজের ইউনিটে ফিরে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
