মুক্তদেশ ডেস্ক: বিশ্ব পরিবেশ দিবসে যখন পরিবেশ রক্ষার নানা অঙ্গীকার উচ্চারিত হচ্ছে, তখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই নদী হালদা ও কর্ণফুলী দূষণের ভয়াবহ চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক, মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং অপরিকল্পিত মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে নদী দুটি হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক প্রাণপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য।
হালদা নদীর দূষণের চিত্র সরকারি দপ্তরের নথিতেই স্পষ্ট। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্য অনুযায়ী, নদীতীরবর্তী শিল্পকারখানা ও অপরিকল্পিত পোলট্রি এবং ডেইরি ফার্মের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের উপজেলার ড্রেনেজ ও সুয়ারেজের ময়লা পানি কাটাখালী, কৃষ্ণখালী, খন্দকিয়া ও মাদারি খালসহ বিভিন্ন সংযোগ খালের মাধ্যমে হালদা নদীতে প্রবেশ করছে। ফলে দিন দিন বাড়ছে দূষণের মাত্রা।
নদীর উজানে মানিকছড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তামাক চাষের কারণে পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে। তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জমিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক বৃষ্টি ও ঢলের পানির সঙ্গে মিশে নদীতে পৌঁছে জলজ পরিবেশের ক্ষতি করেছে। তবে চলতি বছর তামাক চাষ বন্ধ হওয়ায় দূষণের মাত্রা কিছুটা কমেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
হালদার পরিবেশের জন্য আরেকটি বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বালু উত্তোলন। পাশাপাশি ভুজপুর এলাকায় রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে নদীর কিছু অংশে পানির প্রবাহ কমে গিয়ে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে বালুবাহী ও বেপরোয়া গতির ইঞ্জিনচালিত নৌযান মা-মাছ ও বিপন্ন ডলফিনের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, বর্তমানে যেসব দূষণ ঘটছে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে হালদা নদী আরও বড় সংকটে পড়বে।
সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় হালদার বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ড. মনজুরুল কিবরিয়ার মতে, এটি শুধু পরিবেশগত ঝুঁকিই নয়, বরং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগজনক। কারণ খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এই দূষণ মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের প্রাণপ্রবাহ হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী নদীও বহুমাত্রিক সংকটের মুখে রয়েছে। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগরের পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ দখল এবং অতিরিক্ত পলি জমার কারণে নদীটি ক্রমেই তার নাব্যতা, স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, কর্ণফুলীর সংকট কেবল একটি নদীর সংকট নয়; এটি চট্টগ্রাম বন্দর, উপকূলীয় পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুতর হুমকি।
চলতি বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত নদীপথে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যের কারণে পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর তলদেশের পলিতে আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও তামার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, কর্ণফুলীর ৭৯টি স্থানের মধ্যে ৭৭টিতেই ভয়াবহ দূষণ বিদ্যমান। নগরের অন্তত ১৯টি খাল দিয়ে গৃহস্থালি বর্জ্য, ডায়িং কারখানার বর্জ্য এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি নদীতে পড়ছে।
নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম নগরী থেকে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ কোটি লিটার সুয়ারেজ বর্জ্য এবং প্রায় ২৫০ টন পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য বিভিন্ন উপায়ে কর্ণফুলীতে মিশছে। অন্য এক সমীক্ষায় দৈনিক প্রায় ২২ হাজার টন কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীতে ফেলার তথ্য উঠে এসেছে।
রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত ৩০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পেপার মিল, সিমেন্ট কারখানা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্পসহ বিভিন্ন ভারী শিল্পের বর্জ্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নদীতে গিয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্ণফুলীর জন্য নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় নদীর পানি ও পলিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার পানিতে ১৪ থেকে ২৭টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ৭৬ থেকে ২৭২টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। এর অধিকাংশই ফাইবারজাতীয়, যা মূলত পোশাকশিল্পের বর্জ্য, পরিত্যক্ত জাল এবং প্লাস্টিকসামগ্রী থেকে উৎপন্ন হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল হক বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। কর্ণফুলী ও উপকূলীয় জলজ প্রাণীর শরীরে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের উপকূলীয় নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হচ্ছে কর্ণফুলীতে, যার পরিমাণ মোট বর্জ্যের প্রায় ৩৯ শতাংশ। এই বর্জ্য নদী ভরাটের পাশাপাশি জলজ প্রাণী ও পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, একসময় কর্ণফুলীতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। দূষণ ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে অন্তত ৩৫টি প্রজাতি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আর বহু প্রজাতি বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল সরওয়ার বলেন, “বায়ু, শব্দ ও পানিদূষণকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো এখন একটি সমন্বিত পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগ, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।”
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে হালদা ও কর্ণফুলীর বর্তমান অবস্থা আমাদের সামনে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। পরিবেশ রক্ষার প্রতিশ্রুতি কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, কঠোর নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। অন্যথায় দেশের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নদী ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
