মুক্তদেশ ডেস্ক: দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন দীর্ঘ সময় ধরে। একাধিকবার তাঁর মৃত্যুর গুজবও ছড়িয়ে পড়েছিল। অবশেষে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। ৮২ বছরের বর্ণাঢ্য জীবনের ইতি টেনে চিরবিদায় নিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ।
সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে পাশে ছিলেন একমাত্র কন্যা ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী ও ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা। স্ত্রী আনোয়ারা বেগমকে তিনি হারিয়েছিলেন অনেক আগেই। আজ যেন তিনি ফিরে গেলেন বাবা-মায়ের কাছে—সেই মানুষটি, যিনি একদিন বাঙালির ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার সংগ্রামে সামনের সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন।
তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোরালিয়া গ্রামে। বাবা মৌলভী আজহার আলী এবং মা ফাতেমা বেগম। দ্বীপ জেলা ভোলার মাটি থেকে উঠে আসা এক তরুণ পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বর্ষা-বাদলের জলকাদা পেরিয়ে, নদীঘেরা জনপদের জীবন থেকে উঠে এসে তিনি স্থান করে নিয়েছিলেন ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতির প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ গড়ে ওঠে। ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৪ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের পর মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি সম্পন্ন করেন। কিন্তু মাটির গঠন বিশ্লেষণের চেয়ে দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামই তাঁকে বেশি টেনেছিল। সেই টানেই তিনি যুক্ত হন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন তিনি। পরে ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। ঠিক সেই সময়েই বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাস প্রবেশ করছিল এক সংকটময় অথচ যুগান্তকারী অধ্যায়ে।
তোফায়েল আহমেদের নাম ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ডাকসুর ভিপি হিসেবে তাঁর সভাপতিত্বে এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সেদিনই ঘোষিত হয় ঐতিহাসিক ১১ দফা কর্মসূচি, যা পরবর্তীকালে গণআন্দোলনের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
১৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় প্রত্যক্ষ আন্দোলন। ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদের রক্তমাখা শার্ট বুকে ধারণ করে শপথ নেয় ছাত্রসমাজ। ২৪ জানুয়ারি মতিউর, মকবুল, রুস্তম ও আলমগীরের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। ১৫ ফেব্রুয়ারি শহীদ হন সার্জেন্ট জহুরুল হক, আর ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে প্রাণ দেন অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। একের পর এক আত্মদানে উত্তাল হয়ে ওঠে সমগ্র পূর্ববাংলা। আর সেই উত্তাল সময়জুড়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে আন্দোলনের নেতৃত্বের অন্যতম মুখ ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
