মুক্তদেশে ডেস্ক: পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেন্ট মার্টিন দ্বীপে আগামীকাল রোববার থেকে টানা ৯ মাস পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ থাকছে। আজ শনিবার চলতি মৌসুমের শেষ দিনে শেষবারের মতো পর্যটকবাহী জাহাজ দ্বীপে যাতায়াত করছে।
নতুন নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনগামী কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। এতে দ্বীপের পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ ও পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে জীবিকা সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কমানো হয়েছে ভ্রমণের সময়সীমা
সাধারণত প্রতিবছর ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটক ভ্রমণের অনুমতি থাকে। তবে এবার সরকার সময়সীমা কমিয়ে নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। নভেম্বর মাসে দ্বীপে পর্যটকদের রাতযাপনও নিষিদ্ধ ছিল।
দ্বীপবাসীর দাবি, সময় কমিয়ে দেওয়ায় পর্যটনের ভরা মৌসুমেও প্রত্যাশিত আয় করতে পারেননি তাঁরা। ফলে দীর্ঘ ৯ মাস ভ্রমণ বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের জীবনে বড় ধরনের দুর্ভোগ নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
“১ লাখ ২০ হাজার পর্যটক এলেও আয় হয়নি”
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার পর্যটক কক্সবাজার থেকে জাহাজে সেন্ট মার্টিনে ভ্রমণ করেছেন। মোট পর্যটকসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হলেও স্থানীয় পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারেননি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইন বলেন, “আজ সেন্ট মার্টিনগামী জাহাজ সব পর্যটক নিয়ে যাতায়াত করবে। কাল থেকে আর কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। সরকার পরবর্তী সময়ে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
“লাভ তো দূরের কথা, লোকসানে পড়েছি”
সেন্ট মার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহমান বলেন, “অনেক পর্যটক সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। অধিকাংশ ব্যবসায়ী লাভের বদলে লোকসানে পড়েছেন। অতীতে দ্বীপে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। কাল থেকে পর্যটক আসা বন্ধ হলে মানুষের দুর্ভোগ শুরু হবে। নির্বাচন শেষে আবার পর্যটন চালু হলে কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।”
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে পর্যটনখাতের সঙ্গে জড়িত। হঠাৎ করে ভ্রমণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবার মধ্যে হতাশা কাজ করছে।
“ঋণ করেছি, এখন শোধ করব কীভাবে”
দ্বীপের রিকশাচালক নুর আজিম বলেন, “আজ থেকে পর্যটক আসা বন্ধ। কাল থেকে আবার মাছ ধরতে যেতে হবে। রিকশা কেনার জন্য ঋণ নিয়েছি, কিন্তু দুই মাসেও সেই টাকা তুলতে পারিনি। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা—ঋণ শোধ করব কীভাবে।”
কটেজ ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর অভিযোগ করেন, “এবার আমরা তেমন আয় করতে পারিনি। জাহাজ কর্তৃপক্ষ, ঢাকার কিছু বিনিয়োগকারী ও হোটেল ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট গলাকাটা বাণিজ্য করেছে। তার ওপর সরকারের বিধিনিষেধের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে স্থানীয়দের ওপর। এখন ৯ মাস পর্যটক বন্ধ থাকলে দুর্দিন আরও বাড়বে।”
ভ্রমণ খোলা রাখার দাবি
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পর্যটনখাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষ জড়িত। মানবিক দিক বিবেচনায় অন্তত আরও কয়েক মাস, কমপক্ষে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেন্ট মার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কড়াকড়ি নির্দেশনা বহাল
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সেন্ট মার্টিনে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চশব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ কোনো জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ সব ধরনের মোটরচালিত যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। পর্যটকদের পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব পানির ফ্লাক্স সঙ্গে রাখার পরামর্শও রয়েছে।
