মুক্তদেশ ডেস্ক: ব্রাউখেরাই অনুসারীরা শত শত বছর ধরে তুলনামূলক গোপনীয়তার মধ্যে তাদের আচার ও মন্ত্র এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই চর্চার পুনর্জাগরণ ঘটায় অনুসারীরা এখন ভাবছেন—কীভাবে এর মূল সত্তা অক্ষুণ্ন রাখা যায়।
পেনসিলভানিয়া ডাচ অধ্যুষিত অঞ্চলের বিভিন্ন খামারের গায়ে যে রঙিন তারকা-চিহ্নের নকশা দেখা যায়, সেগুলোকে প্রায়ই ‘হেক্স সাইন’ বলা হয়। তবে এসব প্রতীক এখন ওই অঞ্চলের লোকজ জাদুবিদ্যার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হলেও মূলত এগুলো কখনোই ব্রাউখেরাইয়ের আচার-অনুষ্ঠানের অংশ ছিল না বলে জানিয়েছেন কুটজটাউন ইউনিভার্সিটির পেনসিলভানিয়া জার্মান কালচারাল হেরিটেজ সেন্টারের প্যাট্রিক ডনমোয়ার।
অ্যালিস মিলার নিজের কাজকর্ম গোপন রাখতেন। সময়টা ছিল ১৯২০-এর দশক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও আমেরিকাজুড়ে তখনও জার্মানবিরোধী উন্মাদনা তীব্র। পেনসিলভানিয়া জার্মান হিসেবে তার দিকে এমনিতেই যথেষ্ট সন্দেহের চোখ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ প্রমাণ করার মতো সামান্য ভুলের অপেক্ষায় থাকত অনেকে। প্রকাশ্যে লোকজ চিকিৎসা বা জাদুবিদ্যার চর্চা করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত।
তবে তার বংশধরদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিলার নিজে তার ব্রাউখেরাই চর্চাকে ‘জাদুবিদ্যা’ হিসেবে দেখতেন না। এটি ছিল লোকজ চিকিৎসা, বিভিন্ন আচার ও মন্ত্রের সমন্বিত একটি চর্চা, যা তিনি তার খ্রিস্টীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিলিয়ে পালন করতেন। প্রায়ই এর শেষে পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার নামে প্রার্থনা করা হতো।
১৭০০-এর দশকে তার পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে আসার পর থেকেই ব্রাউখেরাই পেনসিলভানিয়া ডাচ সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ফলে এটি ইউরোপীয় লোকবিশ্বাসের উত্তর আমেরিকায় টিকে থাকা সবচেয়ে পুরোনো ধারাগুলোর একটি। কিন্তু তারপরও অনেকে এই চর্চাকে ভয় পেতেন। স্থানীয় আমেরিকান আদিবাসীদের আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গে এর কিছু মিল থাকায় বিদ্রূপ করে একে ‘পাওওয়াওয়িং’ বলা হতো।
বাধ্য হয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়ায় অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, একসময় এই চর্চা হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে অথবা অতীতের একটি নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হবে।
কিন্তু পেনসিলভানিয়া ডাচ পরিবারের নীরব পরিবেশে ব্রাউখেরাই টিকে ছিল। প্রবীণরা কঠোরভাবে মৌখিক পদ্ধতিতে তাদের বংশধর অথবা সম্প্রদায়ের বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের কাছে এই চর্চা হস্তান্তর করতেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে পবিত্র আচারগুলোর গোপনীয়তা রক্ষা করা। কখনো কোনো পুরুষ কোনো নারীকে, আবার কখনো কোনো নারী কোনো পুরুষকে এই বিদ্যা শেখাতেন—যাতে চর্চাকারীদের মধ্যে নারী-পুরুষের সমতা বজায় থাকে।
পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে পুনর্জাগরণ
মিলারের প্রপৌত্র রবার্ট লুশ-শ্রাইওয়ার যখন ১৯৭০-এর দশকে বড় হচ্ছিলেন, তখন তার কাছে বিষয়টি মোটেও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। একবার পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পর তার দাদা তাকে সুস্থ করার জন্য পেনসিলভানিয়া ডাচ ভাষায় একটি সহজ ছন্দ তিনবার উচ্চারণ করেছিলেন। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায় বিশ্বাসী তার বাবা ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মা ছিলেন নার্স। ফলে লোকজ চিকিৎসা ও আধুনিক চিকিৎসা—দুটিই ছিল তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
শ্রাইওয়ার মনে করেন, মিলার যদি জানতে পারতেন যে শুধু তার প্রপৌত্র নিজেই এখন একজন ব্রাউখার হয়েছেন তা নয়, বরং ব্রাউখেরাইয়ের পুনর্জাগরণের অন্যতম অগ্রদূতও হয়েছেন, তাহলে তিনি বিস্মিত হতেন।
শ্রাইওয়ার ইতোমধ্যে কয়েক ডজন তরুণ চর্চাকারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে একটি বইও লিখেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে দল বা সংগঠন—যেগুলোকে কখনো কখনো ‘গিল্ড’ বলা হয়—গড়ে উঠছে। জুম প্রশিক্ষণ এবং এমনকি ইনস্টাগ্রাম রিলও এই পুনর্জাগরণে ভূমিকা রাখছে। অতীতে যেখানে প্রশিক্ষণ ছিল মূলত গোপন ও নিভৃতে, সেখানে এটি একটি বড় পরিবর্তন।
ব্রাউখাররা এমনকি ‘পাওওয়াওয়িং’ শব্দটিও পুনরুদ্ধার করেছেন। একসময় তাদের পূর্বপুরুষদের অপমান করার জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করা হতো।
আধ্যাত্মিক বই প্রকাশক লেউলিনের সম্পাদক হিদার গ্রিনের মতে, ব্রাউখেরাই শুধু সাময়িক কোনো শখ বা আগ্রহ নয়। লেউলিন শ্রাইওয়ারের সাম্প্রতিক বই Heathen Traditions of the Pennsylvania Dutch প্রকাশ করেছে।
গ্রিন বলেন, শ্রাইওয়ার এবং অন্যান্য আধুনিক চর্চাকারী ও শিক্ষক ব্রাউখেরাইকে “একটি কার্যকর আধুনিক চর্চায় পুনরুজ্জীবিত করছেন, যা মানুষ আজ ব্যবহার করতে পারে।”
তবে এই আগ্রহের পুনর্জাগরণ পেনসিলভানিয়া ডাচ লোকজ জাদুবিদ্যার ঐতিহ্য সংরক্ষণে সহায়তা করলেও কেউ কেউ মনে করেন, আধুনিক অভিযোজন অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে।
শ্রাইওয়ার তার গবেষণার জন্য ১৭০ জনেরও বেশি ব্রাউখারের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, তাদের অনেকেই এখনো তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে “অনেক বেশি সতর্ক”। তিনি বলেন, “কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে পরিচিত এমন কারও কাছ থেকে আমাকে সুপারিশ নিতে হয়েছে।”
এই দ্বিধা শ্রাইওয়ার এবং পুনর্জাগরণের সামনের সারিতে থাকা অন্যদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ঐতিহ্যবাহী লোকজ চর্চাকে কীভাবে নতুন করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, অথচ তার মূল সত্তা অক্ষুণ্ন রাখা যায়?
টিকে থাকার উপায় হিসেবে জাদুবিদ্যা
ব্রাউখেরাইয়ের মূল কথা হলো—“চিকিৎসা, সুরক্ষা এবং প্রয়োজনের সময়ে সহায়তার জন্য বিশেষভাবে ব্যবহৃত আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি”—বলেছেন কুটজটাউন ইউনিভার্সিটির পেনসিলভানিয়া জার্মান কালচারাল হেরিটেজ সেন্টারের পরিচালক প্যাট্রিক ডনমোয়ার। তিনি নিজেও একজন ব্রাউখার এবং Powwowing in Pennsylvania: Braucherei & the Ritual of Everyday Life বইয়ের লেখক।
এই চর্চার শিকড় ইউরোপের জার্মানভাষী অঞ্চলগুলোর লোকজ জাদুবিদ্যার বিভিন্ন পদ্ধতিতে। ১৮ শতকে ইউরোপ থেকে অভিবাসীরা এসব আচার সঙ্গে করে মধ্য পেনসিলভানিয়ায় নিয়ে আসেন। পরে এসব আচার আমেরিকার অন্যান্য ঐতিহ্যের দ্বারাও প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে ছিল অ্যাপালাচিয়ান লোকজ জাদুবিদ্যা এবং ‘হুডু’—আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে দাসত্বের শিকার আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত লোকজ জাদুবিদ্যার একটি ধারা।
ব্রাউখেরাই ছিল দৈনন্দিন জীবনের ছন্দের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এর সবচেয়ে পুরোনো অনেক আচার ছিল মানুষ ও গবাদিপশুর চিকিৎসা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাড়ি ও খামারে সৌভাগ্য আনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
চর্চাকারীরা আঁচিল দূর করতেন, পোড়া জায়গার জ্বালা প্রশমিত করতেন এবং রোগীর ক্ষত থেকে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করতেন।
পেনসিলভানিয়া ডাচ অঞ্চলে ব্রাউখেরাই বা পাওওয়াওয়িংয়ের সবচেয়ে প্রচলিত একটি অভিজ্ঞতা হলো ক্ষয়িষ্ণু নয়, বরং বর্ধিষ্ণু চাঁদের আলোতে আলু ব্যবহার করে আঁচিল দূর করার আচার। প্রাথমিক পেনসিলভানিয়া জার্মান বসতিস্থাপনকারীদের জন্য এই লোকজ চিকিৎসা ছিল টিকে থাকার একটি উপায়। বর্তমানে সেই ঐতিহ্য আবার নতুন করে জনপ্রিয় হচ্ছে।
প্রায় ৩০ বছর ধরে ব্রাউখেরাই চর্চা করছেন রোব ফিনিক্স। তার পূর্বপুরুষেরাও এই চর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি এখনো পেনসিলভানিয়াতেই বসবাস করেন। তিনি বলেন, “মূলত এটাই ছিল প্রাথমিক পেনসিলভানিয়া জার্মান বসতিস্থাপনকারীদের টিকে থাকার উপায়। জীবন পার করার জন্য এটি ছিল তাদের ব্যবহারিক নির্দেশিকার মতো।”
চিকিৎসা, প্রার্থনা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক
প্রাথমিক চিকিৎসা-সংক্রান্ত আচারগুলোর মধ্যে ছিল শরীরে হাত রেখে চিকিৎসা করা, কোনো মন্ত্র বা তাবিজ দেওয়া এবং পেনসিলভানিয়া ডাচ ভাষায় তিনবার জোরে প্রার্থনা করা।
বাড়ি সুরক্ষিত রাখতে ব্রাউখাররা দরজার পাশে ঝাড়ু রাখতে পারতেন। বাড়ির জন্য মনকেমন বা স্বদেশের জন্য আকুলতা দূর করতে বাড়ির চার কোণ থেকে সংগ্রহ করা ধুলো কফির মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া হতো।
গবাদিপশুকে পরজীবী থেকে রক্ষা করতে ব্রাউখাররা লিখিত প্রার্থনা তাদের খাওয়াতে পারতেন। আবার কর্মক্ষম ঘোড়ার চিকিৎসার জন্য খামারের মসৃণ পাথর ব্যবহার করা হতো।
চিকিৎসা সাধারণত সরাসরি মানুষের উপস্থিতিতে করা হতো। এতে শারীরিক ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসার পাশাপাশি পরামর্শ বা কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টিও থাকত।
এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই ঐতিহ্যটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ইউ ক্লেয়ারের জার্মান ও ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জশ ব্রাউন। তিনি পেনসিলভানিয়া ডাচ সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করেন।
তিনি বলেন, “আপনার নিজের সম্প্রদায়েরই আরেকজন মানুষ আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছেন এবং আপনাকে একেবারে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিচ্ছেন। পশ্চিমা সমাজে চিকিৎসার যে অত্যন্ত মানবিক ও ব্যক্তিগত দিকটি প্রায়ই হারিয়ে যায়, এটি সেটিকেই গভীরভাবে স্পর্শ করে।”
গোপনীয়তাই ছিল অন্যতম মূলনীতি
গোপনীয়তা, অথবা অন্তত বিচক্ষণতা, ছিল এই ঐতিহ্যের আরেকটি মৌলিক নীতি।
প্রার্থনা এমনকি খুব নিচু স্বরে বলা হতো, যাতে রোগীও তা শুনতে না পারেন। কিছু বিশেষ—এবং কখনো কখনো অধিক শক্তিশালী—মন্ত্র বা আচার লিখে রাখাও ব্রাউখারদের জন্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
চর্চাটি মূলত মৌখিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হতো। এর একটি কারণ ছিল ঐতিহ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা; পাশাপাশি মন্ত্র বা আচার যাতে ভুল মানুষের হাতে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করা হতো।
‘শক্তি হস্তান্তর’ বা কাউকে ব্রাউখেরাই শেখানোর পদ্ধতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ে ভিন্ন ছিল। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এমন ব্যবস্থা রাখা হতো, যাতে গোপনীয়তা বজায় থাকে।
সব ব্রাউখার একইভাবে কাজ করতেন না। ফলে এই ঐতিহ্যের মধ্যে বৈচিত্র্য ছিল, যা আজও বিদ্যমান।
উদাহরণ হিসেবে ফিনিক্স মনে করেন, ব্রাউখেরাই খ্রিস্টীয় প্রেক্ষাপটেই চর্চা করা উচিত। অন্যদিকে ডনমোয়ার ও শ্রাইওয়ারের মতো অনেকে মনে করেন, ঐতিহাসিক প্রমাণে দেখা যায় ব্রাউখেরাই সবসময়ই বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের সমন্বিত পরিবেশে চর্চা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা সেভাবেই চলা উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে লোকজ ঐতিহ্যের নতুন রূপ
ব্রাউখেরাইয়ের কোনো জুম প্রশিক্ষণ সেশনে সাধারণত সরাসরি অংশ নেওয়া যায় না—অন্তত আগে এই চর্চার প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়।
তবে দীর্ঘদিনের চর্চাকারীরা বলছেন, এই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আগ্রহী নতুন ব্রাউখারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
একসময় যে লোকজ ঐতিহ্যটি পারিবারিক ঘর ও ছোট সম্প্রদায়ের মধ্যে গোপনে মৌখিকভাবে টিকে ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেটিই এখন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
তবে এর সঙ্গে নতুন একটি প্রশ্নও তৈরি হয়েছে—ডিজিটাল যুগে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার সময় কীভাবে ব্রাউখেরাইয়ের শতাব্দীপ্রাচীন গোপনীয়তা, আধ্যাত্মিকতা ও মূল সত্তা রক্ষা করা যাবে?
