মুক্তদেশ ডেস্ক: জাতিসংঘকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত বিকল্প সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ শুরুতেই বিদ্রূপ, উপহাস ও কূটনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বোর্ডটির যাত্রা শুরু হলেও, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর তালিকা এবং ট্রাম্পের নিজস্ব অভিবাসন নীতির মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি সামনে এসেছে।
ট্রাম্প উদ্বোধনী মঞ্চে যে ১৮টি দেশের প্রতিনিধিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং যাদের ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (ট্রাভেল ব্যান) নীতির আওতায় রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা সদস্য দেশ
আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তান—এই দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে।
কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—যে দেশগুলোর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশই সীমিত, তারা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি বৈশ্বিক শান্তি সংস্থার মূল অংশীদার হবে? ট্রাম্প একে ‘ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা’ বললেও বাস্তবতায় এটি শুরুতেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে।
কারা আছেন বোর্ডে
ট্রাম্প নিজেই এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। উদ্বোধনী মঞ্চে উপস্থিত দেশগুলোর মধ্যে ছিল:
আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কসোভো, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তান।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো প্রভাবশালী দেশের প্রতিনিধিকে এতে দেখা যায়নি। এমনকি গুঞ্জন রয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সদস্য হতে ‘১ বিলিয়ন ডলারের’ শর্ত
এই উচ্চাভিলাষী বোর্ডের সদস্য হতে প্রতিটি দেশকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অবদান রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, এই শর্ত সংস্থাটিকে কার্যত “ধনকুবেরদের ক্লাব”-এ পরিণত করছে।
ব্রিটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ সময় ট্রাম্প বলেন,
“যখন আমেরিকা সমৃদ্ধ হয়, তখন পুরো বিশ্ব সমৃদ্ধ হয়।”
‘নিউ গাজা’ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন বিতর্ক
সম্মেলনে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ‘নিউ গাজা’ নামে একটি বিতর্কিত উন্নয়ন পরিকল্পনার নকশা উন্মোচন করেন। সিজিআই প্রযুক্তিতে তৈরি এই চিত্রে ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজাকে একটি আধুনিক ‘রিভিয়েরা’ বা পর্যটনকেন্দ্রিক নগরীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা দেখানো হয়।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে:
- অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার
- হাই-রাইজ বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট
- উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্র
- ১ লাখের বেশি নতুন আবাসন ইউনিট
- ৭৫টি আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র
ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই বোর্ড গাজার সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে “বোর্ড অব অ্যাকশন” বলে উল্লেখ করেছেন।
আগের এআই ভিডিওর সঙ্গে মিল
বিশ্লেষকেরা বলছেন, কুশনারের এই নকশাটি গত বছর প্রকাশিত একটি এআই-নির্মিত ভিডিওর সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়, যেখানে ট্রাম্প ও ইলন মাস্ককে গাজার উপকূলে কল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প ঘুরে দেখতে দেখা গিয়েছিল।
ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রেক্ষাপটেই এই ‘বোর্ড অব পিস’-এর ধারণা সামনে আসে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর এই ভিশন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে—যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের সন্দেহ
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বোর্ড অব পিস’ আসলে জাতিসংঘের প্রভাব কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল হতে পারে। তবে যে দেশগুলোর ওপর নিজেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের নিয়েই সংস্থা গঠন—এই বৈপরীত্য সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।
সব মিলিয়ে, উচ্চাভিলাষী ঘোষণা সত্ত্বেও ‘বোর্ড অব পিস’ শুরুতেই কূটনৈতিক সংশয় ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
