মুক্তদেশ ডেস্ক: গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলার মধ্যে ভয়াবহ শীতকালীন ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ঝড়ের কারণে আগেই ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি তীব্র ঠান্ডায় প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ছয় শিশু। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এ তথ্য জানিয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, নিহতদের ভবনগুলো ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বোমাবর্ষণে আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা হামলা, অবরোধ ও ত্রাণ সংকটের ফলে গাজায় জীবনযাত্রা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও গত ১০ অক্টোবর থেকে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, ত্রাণ সংস্থাগুলোর মতে, ঘন ঘন শীতকালীন ঝড় মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়ের মারাত্মক অভাব রয়েছে।
মঙ্গলবার ঝড়ো আবহাওয়ায় নিহতদের মধ্যে দুজন নারী, একজন কিশোরী ও একজন পুরুষ রয়েছেন বলে গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতাল জানিয়েছে। একই সময়ে তীব্র ঠান্ডায় আরও বেশ কয়েকজন শিশু ও বৃদ্ধের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সোমবার রাতে হাইপোথারমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এক বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। আল জাজিরা আরবি জানিয়েছে, অপর্যাপ্ত আশ্রয়ের কারণে একই রাতে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে গাজায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি জেমস এল্ডার জানিয়েছেন, শীতজনিত কারণে অন্তত ছয় শিশু মারা গেছে। এদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, দক্ষিণ গাজায় তাদের সেনাদের কাছাকাছি ছয়জনকে দেখতে পেয়ে গোলাগুলি করা হয়। এতে পশ্চিম রাফাহ এলাকায় অন্তত দুজন নিহত হন। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক দপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার প্রবল বাতাসে শত শত তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র উড়ে গেছে বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজা সিটির ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল এলাকায় একটি আট মিটার উঁচু দেয়াল তাঁবুর ওপর ধসে একই পরিবারের তিন সদস্য—৭২ বছর বয়সী মোহাম্মদ হামুদা, তাঁর ১৫ বছর বয়সী নাতনি ও পুত্রবধূ নিহত হন।
আল-শিফা হাসপাতাল জানায়, ওই ঘটনায় আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আত্মীয়স্বজনেরা মরদেহ উদ্ধার করেন। জানাজা শেষে নিহতের স্বজন বাসেল হামুদা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন,
‘বোমাবর্ষণ বন্ধ থাকলেও আমরা গাজায় মৃত্যুর সব রূপ দেখছি।’ হাসপাতাল সূত্র জানায়, শহরের পশ্চিম অংশে তাঁবুর ওপর দেয়াল ধসে আরও এক নারী নিহত হয়েছেন। গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, ইসরায়েলি যুদ্ধ ও পণ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার অধিকাংশ মানুষ পর্যাপ্ত আশ্রয় ছাড়াই বসবাস করছে। বর্তমানে গাজার বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরের পরিবর্তে অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঝড়ের সময় উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় না নিতে সতর্ক করছেন। ত্রাণ সংস্থাগুলোর অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও পর্যাপ্ত আশ্রয় সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, তারা তাঁবু, ত্রিপল, কম্বল, পোশাকসহ পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসামগ্রী বিতরণ করছে। তবে ইসরায়েল জরুরি মানবিক সহায়তা ও আশ্রয় সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামাস এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে জানায়, ক্রমবর্ধমান মৃত্যু ও রোগের বিস্তার প্রমাণ করে গাজা ‘গণহত্যার সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায়’ অতিক্রম করছে। সিভিল ডিফেন্স জানায়, হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ছে, বিশেষ করে শিশুরা শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গাজার ফিলিস্তিনি এনজিও নেটওয়ার্কের পরিচালক আমজাদ শাওয়া আল জাজিরাকে বলেন, শীতকালীন ঝড়ের পর পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার পরিবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজা সিটির মেয়র ইয়াহিয়া আল-সাররাজ বলেন, ফিলিস্তিনিরা চরম মানবিক সংকটে আটকা পড়েছে। তিনি ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান, যাতে ত্রাণ প্রবেশ ও পুনর্নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করা যায়।
