এম. হাসান :
অস্তিত্ব মানে কী? আপনি কীভাবে আপনি? এবং আপনি কীভাবে জানবেন আপনি কে?
আপনি যদি নিজেকে নির্মাণ করতে কোনো উদ্যোগ না নেন, তবে আপনি কে বা কী হতে চান তা হওয়া সম্ভব নয়। আপনি কে, তা নির্ধারিত হয় আপনার উদ্দেশ্যপূর্ণ কর্মের মাধ্যমে। চিন্তা করা, কল্পনা করা এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে পরিচালনা করাও একেকটি সচেতন পদক্ষেপ।
প্রত্যেক কাজের আগে আমরা একটি পরিস্থিতি, ঘটনা বা অবস্থার মুখোমুখি হইÑএটিই আমাদের অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা মানে এমন কিছু যা আমাদের জীবনে প্রবেশ করে, তা আমরা চাই বা না চাই। এগুলো ভালো, খারাপ, আনন্দদায়ক কিংবা কষ্টদায়ক হতে পারে। কিন্তু আমরা কখনোই ভুলে যেতে পারি না যে, আমাদের প্রত্যেকেরই সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি আছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি কাজ। আপনি যখন কোনও কিছুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন আপনি একটি কাজ করার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। এই প্রক্রিয়া আপনার কাজের অংশ। এই প্রক্রিয়াকালীন সময়ে, আপনার মানব মস্তিষ্ক প্রতিফলন করে, তুলনা করে, সংযুক্ত করে এবং আপনার অতীতের অভিজ্ঞতাগুলিকে বর্তমানের সঙ্গে মেলায়। আপনি যখন এই প্রক্রিয়া শেষ করেন, তখন আপনি আপনার সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। আপনি জানেন, একটি সিদ্ধান্ত ভালো বা খারাপ, চিন্তাশীল বা অবিবেচক হতে পারে। তখনই আপনার “সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা” বা “স্বাধীন ইচ্ছা” সম্মানিত, বিবেচিত ও ব্যবহার করা হয়।
আপনার সিদ্ধান্তই আপনার পরিচয়:
আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার সম্মান ও বিবেচনার ভিত্তিতে আপনি যে কাজ করেন তা আপনার এই ক্ষমতার ব্যবহারের মাত্রাকে প্রতিফলিত করে। আপনি আপনার এই ক্ষমতার ১০০%, ৭৫%, ৫০%, বা ২৫% ব্যবহার করতে পারেন। আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ০% তখনই হয়, যদি আপনি অন্য কাউকে আপনার পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে অনুরোধ করেন। সেই ক্ষেত্রে, আপনি আপনার ১০০% সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্যকে হস্তান্তর করেন, যা আপনার “জন্মগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা” ব্যবহার করেই ঘটে। সংক্ষেপে, আপনার “জন্মগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা” হচ্ছে সেই উপাদান বা বস্ত্ত যা আপনাকে একজন মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করে, আকার দেয় ও গঠন করে। আপনার “স্বাধীন ইচ্ছা” বা “সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা” ছাড়া, আপনি এমন এক দেহ যা কার্যকরী হলেও কোন পছন্দ, বিবেক বা জীবনবোধ ছাড়াই চলছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পছন্দ করাই আপনাকে জীবন দেয় ভালো জীবন হোক বা খারাপ।
আপনার জীবন, আপনার চয়েস:
আপনার জীবনযাত্রা -ভালো বা খারাপ আপনার সিদ্ধান্তের ফল। এটি বুঝতে পারা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি, কারণ এতে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে, আপনার জীবন আপনার নিজের হাতে। এজন্যই জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ যেমনÑস্বৈরশাসন, দাসত্ব, নিপীড়ন ইত্যাদিÑমানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
একটি মুক্ত সমাজে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেনÑকারা আপনার জীবনে থাকবে বা থাকবে না। যেসব অভিজ্ঞতা আপনি গ্রহণ করেন, তা আপনার চিন্তায়, সিদ্ধান্তে এবং জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হয়। আপনার সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে আপনার জীবন কিসে পূর্ণ হবে।
আপনার চয়েস, আপনার পরিচয়:
সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি সম্মতি ফর্মে স্বাক্ষরের মতো। যখন আপনি কোনও সম্মতি ফর্মে স্বাক্ষর করেন, তখন আপনি তার শর্তাবলীতে সম্মত হন। তেমনই, আপনি যখন কোনও কিছু আপনার জীবনে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন আপনি তা স্বাগত জানান এবং তা আপনার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। আপনি যা কিছু ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার জীবনে গ্রহণ করেন, ভালো বা খারাপ, তা আপনি কেÑএই পরিচয় তৈরিতে সাহায্য করে। যত বেশি আপনি কিছু গ্রহণ করেন, তত বেশি আপনি তা দিয়ে নিজেকে চিহ্নিত করেন। এই সবকিছুর সমষ্টিই তৈরি করে আপনার পরিচয়Ñআপনি কে।
আপনি কে তা হতে গেলে এর ভালো ও খারাপ উভয় ফলাফল থাকতে পারে। খারাপ ফলাফল হতে পারে আপনার খারাপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে: যেমন দেরি করা, অজুহাত দেখানো, অসতর্কতা, নিজের যত্ন না নেওয়া, বা আপনার লক্ষ্য পূরণে উদাসীনতা। ভালো ফলাফল হতে পারে আপনার স্বাস্থ্যকর ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে: সময় ব্যবস্থাপনা, অনুপ্রাণিত থাকা, নিজের যত্ন নেওয়া, সঠিকভাবে খাওয়া, ব্যায়াম করা, শিক্ষা গ্রহণ, লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা, ইতিবাচক চিন্তা, নিজেকে ভালোবাসা, নিজেকে ও অন্যদের সম্মান করা, এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে নিজের লক্ষ্য পূরণে কাজ করা।
শেষ প্রশ্ন: আপনি কে?
আপনি কে? আপনি কোথায়? আপনি কেন? আপনি কীভাবে?
আজই হোক সেই দিন, যেদিন আপনি সাহস নিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করবেন, গড়ে তুলবেন এবং তুলে ধরবেন সেই সত্যিকারের ‘আপনি’Ñযার জন্য এই পৃথিবী অপেক্ষা করছে। মনে রাখবেন একটি সমাজ গঠিত হয় বৈচিত্র্যময় মানুষের মাধ্যমে এবং ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিরাই বিশ্ব পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।
প্রেরণাদায়ক মূল বার্তা: আপনি কে তা কীভাবে হবেন। আপনি যদি নিজেকে হতে কোনও পদক্ষেপ না নেন, তাহলে আপনি কে তা হওয়া সম্ভব নয়। আপনি নিজেকে হতে পারবেন। কারণ আপনার সেই শক্তি আছে। আপনি কে তা আপনার সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রতিফলন। মনোযোগ দিন এবং নিজেকে মনে করিয়ে দিন:
১. আপনি কেÑতা আপনার সিদ্ধান্তে নির্ভর করে
২. আপনি কে, তা নির্ধারণ করে আপনার সচেতন কাজ।
৩. অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
৪. আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি আছে।
৫. এটাই আপনাকে সচেতন মানুষ বানায়।
৬. আপনি কী গ্রহণ করছেন, আর কী বর্জন করছেন, তা-ই গড়ে তোলে আপনার পরিচয়।
৭. সঠিক ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আপনাকে আরও ভালো জীবন এনে দিতে পারে।
৮. মনে রাখবেন জীবনের মাত্র একটি সিদ্ধান্ত আপনার জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। আবার আপনাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেবার সময় অবশ্যই ভেবে চিন্তে নেবেন। কারণ জীবন আপনার এবং একটায়।
