মুক্তদেশ ডেস্ক: কৌশলী রাজনীতিক হিসেবে চীনের নেতা দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিচ্ছেন। বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য এবং চীনের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য এটি খারাপ খবর।
ভাবুন তো, লন্ডনে বসে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যদি স্কটল্যান্ডের জনগণকে বলে দেন যে তাদের নিজস্ব পার্লামেন্ট, জাতীয় ফুটবল দল থাকতে পারবে না কিংবা তারা ‘সলটায়ার’—স্কটল্যান্ডের জাতীয় পতাকা—উড়াতে পারবে না। অথবা ওয়েলসের জনগণকে যদি বলা হয়, তাদের ভাষা ও কবিতা নিষিদ্ধ এবং স্কুলে আর সেগুলো পড়ানো যাবে না। এর পর যে তীব্র প্রতিবাদ সৃষ্টি হতো, তাতে সম্ভবত যুক্তরাজ্যের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ত।
অথচ চীনের কমিউনিস্ট সম্রাট হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মোটামুটি একই ধরনের নির্দেশ দিচ্ছেন দেশটির প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষকে। চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জনগোষ্ঠীর বাইরে থাকা এই ৫৫টি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ।
শি দাবি করেন, তার ‘সিনিসাইজেশন’ বা চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে একীভূতকরণ নীতি, যা নতুন ‘জাতিগত ঐক্য’ আইনে প্রতিফলিত হয়েছে, জাতীয় পরিচয় ও সামাজিক সংহতি শক্তিশালী করবে। বাধ্যতামূলকভাবে ম্যান্ডারিন ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও উন্নত হবে বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষায়, একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ চীন গড়ে তুলতে সংখ্যালঘুদের ‘ডালিমের দানার মতো শক্ত করে একে অপরকে জড়িয়ে থাকতে হবে।’
কিন্তু তিব্বতি, মঙ্গোল, উইঘুরসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত। তারা এই নীতিকে এমন এক জোরপূর্বক একীভূতকরণ হিসেবে দেখছে, যার লক্ষ্য কমিউনিস্ট পার্টির সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে সবাইকে একই ধরনের সংস্কৃতি ও চিন্তার মধ্যে নিয়ে আসা। তাদের কাছে এটি অন্য নামে জাতিগত নির্মূলেরই একটি রূপ।
সংখ্যালঘুদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে
নতুন আইনটির নিন্দা করেছে পশ্চিমা সরকারগুলো—যদিও খুব জোরালোভাবে নয়। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও কঠোর ভাষায় এর সমালোচনা করেছে।
গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ‘ফ্রি তিব্বত’ আন্দোলনের কর্মী লোবগা রাংজেন নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন এবং পরে মারা যান। তার মৃত্যু অল্প সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
কিন্তু এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়।
তিব্বতে ব্যাপক দমন-পীড়ন এবং জিনজিয়াংয়ে নির্মম ‘পুনঃশিক্ষা’ শিবির—শি জিনপিংয়ের ভিন্নমত, বৈচিত্র্য ও ভিন্ন পরিচয়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান অভিযানের দীর্ঘদিনের দুটি উদাহরণ।
নতুন আইন এবং এর কঠোর শাস্তির বিধান—যা বিদেশে বসবাসকারী চীনা নাগরিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে—আগের এসব প্রচেষ্টাকে আরও আইনি ভিত্তি দিচ্ছে।
এর লক্ষ্য হলো এমন একটি রাজনৈতিকভাবে অনুগত ও ভীত জনগোষ্ঠী তৈরি করা, যারা শি এবং কমিউনিস্ট পার্টির ইচ্ছার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করবে না।
চীন নিয়ে পশ্চিমে ‘অসহায় সমর্পণ’?
চীনের আচরণ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে এক ধরনের দুর্বলতাজনিত নৈরাশ্য তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, হংকংয়ে গণতন্ত্রের অবসান, গণতন্ত্রপন্থী কর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক মামলা কিংবা স্বাধীন খ্রিষ্টান গির্জা ও ‘অনুমোদনহীন’ ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর ওপর কঠোর দমন—সব ক্ষেত্রেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
মনে হচ্ছে, শির চীন এখন এত বড়, এত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং সামরিকভাবে এতটাই হুমকিস্বরূপ যে তাকে প্রভাবিত করা, এমনকি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টাও অর্থহীন।
চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় সামনে এলে পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষে দূরে সরে থাকা যেন সহজ।
ব্রিটেনও এর ব্যতিক্রম নয়। বাণিজ্যিক স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে এবং মানবাধিকার প্রশ্নে নীরব থেকে ব্রিটেনসহ পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো চীন নিয়ে একটি সুসংহত নীতি প্রণয়নে ব্যর্থ হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আরও আক্রমণাত্মক শি
তবে শি জিনপিংয়ের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ও আপসহীন নীতি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়।
প্রায় ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ৭৩ বছর বয়সী শি এখন তার আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও আত্মবিশ্বাসী ও কঠোর হয়ে উঠছেন।
তার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- চীনকে বিশ্বের প্রধান পরাশক্তিতে পরিণত করা;
- যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দেওয়া;
- নতুন বহুমেরুকেন্দ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থার অপরিহার্য কেন্দ্র হিসেবে চীনকে প্রতিষ্ঠা করা;
- তাইওয়ানকে চীনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া;
- এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
সবকিছু মিলিয়ে তার লক্ষ্য যেন একটাই—মাও সেতুংয়ের পর চীনের সবচেয়ে মহান নেতা হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করা।
২০২৭ হতে পারে শির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বছর
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ২১তম কংগ্রেস সামনে রেখে ২০২৭ সাল শি জিনপিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আর তিনি এরই মধ্যে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তার স্বৈরশাসনকে বর্তমানে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলেই মনে হচ্ছে।
চীনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ সপ্তাহে হেবেই প্রদেশের সমুদ্রতীরবর্তী বেইদাইহে অবকাশকেন্দ্রে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। সেখানে দলীয় নেতাদের মধ্যে আনুগত্য ও শৃঙ্খলা আরও কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠার শির উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়ার কথা রয়েছে।
এর সরকারি ভাষ্য হলো—‘দলের পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর আত্মশাসনের ধারাবাহিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা।’
বেইদাইহের বৈঠক এবং অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় আরেকটি বৈঠক এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন চীনের রাজনৈতিক ও সামরিক শীর্ষ পর্যায়ে প্রায় স্তালিনীয় কায়দায় শুদ্ধি অভিযান চলছে।
শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের একের পর এক সরিয়ে দেওয়া বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শির ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
জাপান ও ফিলিপাইনের সঙ্গে উত্তেজনা
চীনের আরও আত্মবিশ্বাসী আন্তর্জাতিক অবস্থানের লক্ষণ এখন সর্বত্র দেখা যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীন জাপানের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী উত্তেজনা বাড়িয়েছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত এলাকায় ফিলিপাইনের সঙ্গেও ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
তাইওয়ানকে ভয় দেখানো ও চাপ প্রয়োগও অব্যাহত রয়েছে।
এই সপ্তাহে জাপানের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে চীনকে ‘নজিরবিহীন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে সতর্ক করা হয়েছে, চীনের হুমকি জাপানের আরও কাছে চলে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারোও আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চীনের ‘জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের’ কঠোর সমালোচনা করেছেন।
ইরান ও রাশিয়ার পাশেও চীন
শি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামছেন।
খবরে বলা হচ্ছে, চীন ইরানকে ৪০০টি পর্যন্ত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের পরিকল্পনা করছে।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনেও চীন ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে আত্মবিশ্বাসী বেইজিং বাণিজ্যিক অস্ত্রকেও ব্যবহার করছে—যে ধরনের কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পছন্দ করেন।
গত বছর চীন গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা খনিজের (rare earth minerals) রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। এতে ওয়াশিংটনে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়।
শুধু এই সপ্তাহেই ট্রাম্পের নতুন শুল্কের পাল্টা জবাব হিসেবে চীন ড্রোন প্রযুক্তি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।
ট্রাম্পের নীতিই শিকে সুযোগ করে দিচ্ছে?
শি জিনপিংয়ের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসের পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
লেখকের মতে, ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছেন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখাচ্ছেন।
ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ তার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মতো ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে।
ফলে অনেক দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রকে আর নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে না।
চীনের জন্য ট্রাম্পের এশিয়ার প্রতি মনোযোগ কমিয়ে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে মনোযোগ বাড়ানো একটি বড় সুযোগ—যতদিন সেই সুযোগ থাকবে, বেইজিং সেটি কাজে লাগাতে চাইবে।
সম্ভবত এ কারণেই মে মাসে বেইজিংয়ে বৈঠকের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে শি জিনপিং আগামী মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটন সফরে সম্মত হয়েছেন।
পরবর্তী বড় লড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে
প্রস্তাবিত শীর্ষ বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI।
যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়ছে যে, তারা AI প্রতিযোগিতায় চীনের কাছে পিছিয়ে পড়তে পারে।
চীনা বিশ্লেষকদের মতে, চীন যখন বিশ্বের ২৮টি দেশের সঙ্গে AI অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে—যার বেশির ভাগই গ্লোবাল সাউথের দেশ—তার পরই ট্রাম্প বৈঠকের অনুরোধ করেন।
ট্রাম্প গত মাসে AI সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এটি সম্ভবত মানুষ এখন পর্যন্ত যা দেখেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয়।’
তার মতে, ‘যে পক্ষ এই প্রতিযোগিতায় জিতবে, সম্ভবত শেষ পর্যন্ত তারাই জিতবে।’
এখানে ট্রাম্প সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন—যে পক্ষ AI প্রতিযোগিতায় জয়ী হবে, তারাই একবিংশ শতাব্দীর পরাশক্তির মুকুট অর্জন করবে।
আর সেই প্রতিযোগিতায় শি জিনপিং কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকতে চাইছেন না।
