মুক্তদেশ ডেস্ক: চলছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর—ফিফা বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগ থেকেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে না পারলেও দেশের আনাচকানাচে বিশ্বকাপের উন্মাদনা দেখা যায়।
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে শুরু হয় এক ভিন্ন ধরনের উৎসব। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই চলে প্রিয় দল নিয়ে আলোচনা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও ইতালির মতো দলের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় বিশেষ আগ্রহ। প্রিয় দলের জার্সি পরা, পতাকা ওড়ানো কিংবা বাড়িঘর সাজানোর মাধ্যমে সমর্থকেরা প্রকাশ করেন ভালোবাসা।
বিশ্বকাপকে ঘিরে অনেক সময় কে কত বড় পতাকা বানাতে পারেন, তা নিয়েও চলে প্রতিযোগিতা। উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কেউ কেউ বিশাল আকারের পতাকা তৈরি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। তবে এই আবেগের মধ্যেই রয়েছে কিছু আইনি বিধিনিষেধ।
বিদেশি পতাকা উত্তোলন নিয়ে কী বলে আইন?
অনেক সমর্থক বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা বিভিন্ন স্থানে প্রিয় দলের দেশের পতাকা টাঙিয়ে দেন। কেউ কেউ একই খুঁটিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার সঙ্গে বিদেশি পতাকাও উত্তোলন করেন। বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন এলাকায় বিদেশি পতাকার আধিক্য দেখা গেলেও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
জাতীয় পতাকা একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রতীক। বাংলাদেশে জাতীয় পতাকার ব্যবহার ও উত্তোলনের নিয়ম বাংলাদেশ পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে কোনো ব্যক্তিগত ভবন বা যানবাহনে বিদেশি পতাকা উত্তোলন করা যাবে না। বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনৈতিক মিশন ছাড়া অন্য কোথাও কোনো দেশের পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকারের বিশেষ অনুমোদন প্রয়োজন।
অনুমোদন ছাড়া বিদেশি পতাকা উত্তোলন করলে তা পতাকা বিধিমালা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জাতীয় পতাকার মাপ
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা গাঢ় সবুজ রঙের আয়তাকার ক্ষেত্রের মধ্যে লাল বৃত্ত সংবলিত। পতাকার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ১০:৬।
ভবনে ব্যবহারের জন্য প্রচলিত মাপ:
- ১০ ফুট × ৬ ফুট
- ৫ ফুট × ৩ ফুট
- ২.৫ ফুট × ১.৫ ফুট
গাড়িতে ব্যবহারের জন্য:
- বড় গাড়ি: ১৫ ইঞ্চি × ৯ ইঞ্চি
- ছোট ও মাঝারি গাড়ি: ১০ ইঞ্চি × ৬ ইঞ্চি
আন্তর্জাতিক সম্মেলন বা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিল পতাকার মাপ ১০ ইঞ্চি × ৬ ইঞ্চি।
কখন জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়?
বাংলাদেশ পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২-এর ৪ ধারায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বাসভবন, সংসদ ভবন, হাইকোর্ট, সচিবালয়, আদালত, কারাগার, পুলিশ স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে কার্যদিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত থাকে।
এ ছাড়া বিশেষ দিবসগুলোতে, যেমন—
- ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস
- ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস
- ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস
- সরকার ঘোষিত অন্যান্য দিবস
জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিধান রয়েছে।
বিদেশি পতাকার সঙ্গে জাতীয় পতাকার ব্যবহার
যদি অন্য দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়, তবে বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মানজনক স্থান (Place of Honour) দিতে হবে।
নিয়ম অনুযায়ী:
- বাংলাদেশের পতাকা অন্য দেশের পতাকার ওপরে থাকবে না।
- দুটি পতাকা থাকলে বাংলাদেশের পতাকা ভবনের ডান পাশে থাকবে।
- বাংলাদেশের পতাকা প্রথমে উত্তোলন এবং সর্বশেষে নামাতে হবে।
- পতাকা কখনো মেঝে, মাটি বা পানির সংস্পর্শে আনা যাবে না।
গাড়ি ও জলযানে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের নিয়ম
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী ও সমমর্যাদার ব্যক্তিরা ভ্রমণকালে গাড়ি ও জলযানে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে পারেন।
তবে ১৯৭২ সালের পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী সাধারণভাবে সংসদ সদস্য বা সিটি মেয়রদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়নি।
পতাকার অপব্যবহার নিষিদ্ধ
জাতীয় পতাকা—
- কোনো আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
- পতাকার ওপর লেখা বা ছবি আঁকা যাবে না।
- ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অনুমোদন ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
- এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যাতে পতাকা ছিঁড়ে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শুধু পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফনের ক্ষেত্রে কফিনে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
পতাকা উত্তোলন ও নামানোর নিয়ম
জাতীয় পতাকা দ্রুততার সঙ্গে উত্তোলন করতে হবে এবং সম্মানের সঙ্গে নামাতে হবে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সূর্যাস্তের আগে পতাকা নামাতে হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে রাতে পতাকা উত্তোলিত রাখা যেতে পারে।
যেমন:
- সংসদের রাতের অধিবেশন
- রাষ্ট্রীয় শপথ অনুষ্ঠান
জাতীয় পতাকা অবমাননার শাস্তি
বাংলাদেশ পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ প্রণীত হলেও ২০১০ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে পতাকা অবমাননার জন্য শাস্তির বিধান যুক্ত হয়।
জাতীয় পতাকা অবমাননার ক্ষেত্রে শাস্তি হতে পারে—
- সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড
- ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা
- অথবা উভয় দণ্ড
বিশ্বকাপের উন্মাদনা অবশ্যই আনন্দের বিষয়। তবে সেই আনন্দ প্রকাশের ক্ষেত্রেও দেশের আইন ও জাতীয় পতাকার মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা থাকুক, পাশাপাশি সম্মান থাকুক নিজের দেশের প্রতীক ও আইনকানুনের প্রতিও।
