মুক্তদেশ ডেস্ক: মশার কামড় মানেই ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া কিংবা ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগের আতঙ্ক। তবে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ নেওয়া ম্যালেরিয়া নিয়ে এবার এক অবিশ্বাস্য ও নতুন আশার আলো দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। রোগ ছড়ানোর মাধ্যম যে মশার কামড়, সেই কামড়কেই নাকি ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব!
সম্প্রতি বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার ‘ওয়াল্টার অ্যান্ড এলিজা হল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চ’-এর এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, মশার কামড়কে ‘ন্যাচারাল ভ্যাকসিন বুস্টার’ বা প্রাকৃতিক টিকার বুস্টার ডোজ হিসেবে কাজ করানোর একটি পরীক্ষামূলক পদ্ধতি তৈরি করেছেন তারা। ইঁদুরের ওপর চালানো এই গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা মেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সাধারণত ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মশা কামড়ালে পরজীবী (প্যারাসাইট) মানবদেহে প্রবেশ করে এবং প্রথমে লিভার বা যকৃতে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করে। এরপর এটি রক্তে ছড়িয়ে পড়ে রোগ সৃষ্টি করে।
গবেষকরা মশার মাধ্যমে শরীরে ঢোকা অল্প পরিমাণের পরজীবীকে ঠেকানোর জন্য ডব্লিউএম৩৮২ এবং এমকে-৭৬০২ নামে দুটি পরীক্ষামূলক অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল ওষুধ ব্যবহার করেছেন। এই ওষুধ দুটি পরজীবীর বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ‘প্লাজমেপসিন ৯’ ও ‘প্লাজমেপসিন ১০’ নামের দুটি প্রোটিন ধ্বংস করে দেয়।
এর ফলে পরজীবীটি যকৃতেই ধ্বংস হয়ে যায় এবং রক্তে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু যকৃতে অবস্থানকালে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) ওই পরজীবীটিকে ভালোভাবে চেনার ও পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পায়। সহজ কথায়, রোগ আক্রান্ত না করেই ইমিউন সিস্টেমকে রোগটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ‘মহড়া’ দেওয়ার সুযোগ করে দেয় এই পদ্ধতি।
অস্ট্রেলিয়ার ‘ওয়াল্টার অ্যান্ড এলিজা হল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল রিসার্চ’-এর সহযোগী অধ্যাপক জাস্টিন বডি বলেন, ‘নতুন এই রাসায়নিক যৌগ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা মশার কামড়কে ইঁদুরের শরীরে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতায় রূপান্তর করতে পেরেছি। এটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন হতে পারে।’
তিনি আরও জানান, অল্প পরিমাণ পরজীবী প্রবেশ করলেও শরীরে যে ইমিউন রেসপন্স তৈরি হয় তা প্রচলিত অনেক ভ্যাকসিনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী। এটি শরীরে অ্যান্টিবডির পাশাপাশি ‘সিডি৮+ টি সেল’ এবং যকৃতে অবস্থানকারী ‘মেমোরি টি সেল’ তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে পুনরায় সংক্রমিত হলে দ্রুত পরজীবী ধ্বংস করতে পারে।
গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো—একবার শরীরে প্রাথমিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গেলে, পরবর্তীতে ম্যালেরিয়া বহনকারী মশা কামড়ালে তা ন্যাচারাল বুস্টার ডোজ বা প্রতিষেধকের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
তবে পদ্ধতিটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও গবেষকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের এখনই ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মশার কাছে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এটি এখনো কেবল গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর সফল হয়েছে। মানুষের জন্য এটি পুরোপুরি নিরাপদ ও কার্যকরী কিনা, তা নিশ্চিত করতে আরও বিশদ পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন
