মুক্তদেশ ডেস্ক: এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে র্যাবের পরিবর্তে ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস (পিপিএফ)’ নামে পুলিশের নতুন একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হবে।
এ বিষয়ে ‘পিপলস প্রটেকশন ফোর্সেস আইন-২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) শেষে এটি অনুমোদনের জন্য শিগগির মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত ১৮ মে র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নতুন একটি আধুনিক ও পেশাদার এলিট ফোর্স গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে একটি আধুনিক বাহিনী গঠনে সরকার কাজ করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খসড়া অনুযায়ী, নতুন বাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ দমন, মাদকদ্রব্য, বেআইনি অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে।
র্যাবের মতোই বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত হবে পিপিএফ। বাহিনীর একজন মহাপরিচালক (ডিজি) থাকবেন, যিনি পুলিশের কর্মকর্তা হবেন এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করবেন। বাহিনীর সদস্যরা অপরাধে জড়ালে তাদের নিজ নিজ সংস্থার আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, পিপিএফ সদস্যদের তল্লাশি, আটক ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সমান ক্ষমতা থাকবে। তবে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা কোনো বস্তু জব্দ করার পর তা দ্রুত নিকটস্থ থানায় হস্তান্তর করতে হবে এবং এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে।
প্রস্তাবিত আইনে পিপিএফের কার্যপরিধিতে আটটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা এবং সরকার বা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, র্যাবের সব সম্পদ, দায়-দেনা ও অন্যান্য স্বার্থ নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তর হবে। র্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই পিপিএফের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সাবেক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে সংস্থাটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
কেন বিলুপ্ত হচ্ছে র্যাব
গত দুই দশকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে র্যাব সমালোচিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে র্যাবের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। একইভাবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনও র্যাবের সংস্কার বা বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিল।
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
র্যাব প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালের মার্চে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ এই ইউনিট গঠন করা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠার পর সন্ত্রাস দমন অভিযানে আলোচনায় আসে র্যাব। তবে পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, ক্রসফায়ার ও গোপন বন্দিশালার অভিযোগসহ বিভিন্ন ঘটনায় সংস্থাটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাবে গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এসব অভিযোগ ও অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়েই সরকার নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
