মুক্তদেশ ডেস্ক: যে কম্পিউটার প্রোগ্রাম চালু হতে সব সময় দেরি করে, যে অ্যাপ বারবার ক্র্যাশ করে, কিংবা যে পুরোনো ল্যাপটপটি সবচেয়ে অসুবিধাজনক সময়ে হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দেয়—লক্ষাধিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবীর কাছে এসব ডিজিটাল বিড়ম্বনা এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
আলাদাভাবে দেখলে এসব সমস্যার কোনোটিই হয়তো কারও পুরো দিনের কাজ নষ্ট করে দেওয়ার মতো গুরুতর নয়। কিন্তু একটি কর্মসপ্তাহজুড়ে কিংবা পুরো প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীর ক্ষেত্রে হিসাব করলে ‘ডিজিটাল ভোগান্তি’র কারণে নষ্ট হওয়া সময় ও শ্রমের পরিমাণ বেশ উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান টিমভিউয়ারের (TeamViewer) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের সমস্যার কারণে ৪২ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি রাজস্ব হারিয়েছে।
একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি
এত দিন পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে মূলত সমস্যা দেখা দেওয়ার পর তা সমাধানের পদ্ধতিতে। ফলে একই সমস্যার সমাধান বারবার করতে হয়েছে।
টিমভিউয়ারের এআই, অটোমেশন ও প্রযুক্তি বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান শ্রোটেল বলেন, প্রচলিত আইটি সহায়তা ব্যবস্থাটি বেশ পুরোনো ধাঁচের। তাঁর ভাষায়, ‘আমার কম্পিউটারে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমি একটি অভিযোগ জমা দিই। কোনো একসময় কেউ সেই অভিযোগ গ্রহণ করেন। এরপর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সমস্যাটি সমাধান করেন।’
এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই কর্মীদের উৎপাদনশীল কাজের সময় নষ্ট হয়। সমাধানের অপেক্ষায় থাকতে হয় তাঁদের।
এর সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষতি হলো উৎপাদনশীলতা ও বিক্রিতে নেতিবাচক প্রভাব। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কথা জানিয়েছে।
তবে ডিজিটাল ভোগান্তি যখন ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদেরও হারাতে শুরু করে। বারবার একই ধরনের সমস্যায় পড়ে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে না পারার হতাশা একসময় কর্মীকে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তখন তিনি হয়তো নিজের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) হালনাগাদ করেন এবং নতুন চাকরির জন্য নিয়োগদাতার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।
টিমভিউয়ারের গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল ভোগান্তির কারণে ৩৬ শতাংশ কর্মী তাঁদের বর্তমান প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবেছেন।
শ্রোটেলের ভাষায়, ‘ডিজিটাল ভোগান্তি বলতে এমন সব পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন আমার কর্মক্ষেত্রের ডিজিটাল ব্যবস্থা আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করে না বা সাড়া দেয় না। একজন ব্যবহারকারী হিসেবে তখন আমার মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হয়। ডিভাইসটি কাজ করছে না, ধীরগতিতে চলছে, আর আমি বিরক্ত হয়ে পড়ছি। এমনকি একসময় হয়তো চিৎকারও শুরু করি!’
তিনি আরও জানান, টিমভিউয়ারের গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল ভোগান্তির কারণে প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ কর্মক্ষেত্রে কেঁদেও ফেলেছেন।
অনেকে মনে করতে পারেন, সমস্যার সমাধান হলো প্রতিক্রিয়াভিত্তিক (রিঅ্যাকটিভ) সহায়তার পরিবর্তে আগাম (প্রোঅ্যাকটিভ) সহায়তা চালু করা। কিন্তু শ্রোটেলের মতে, বিষয়টি তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে। তাঁর ভাষায়, প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরি হবে আগাম সহায়তা থেকে পূর্বাভাসভিত্তিক (প্রেডিকটিভ) সহায়তা ব্যবস্থায় রূপান্তরের মাধ্যমে। আর এ ক্ষেত্রে কর্মীদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতাকে (ডিজিটাল এমপ্লয়ি এক্সপেরিয়েন্স) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
যে সমস্যা শনাক্ত করা যায় না, তার সমাধানও সম্ভব নয়
কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছেন শ্রোটেল। বর্তমানে তিনি টিমভিউয়ার ওয়ান (TeamViewer ONE) নামের একটি সমন্বিত এআই-সমৃদ্ধ আইটি প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দূর থেকে কাজ করার প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে যাত্রা শুরু করা টিমভিউয়ারকে এই প্ল্যাটফর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কর্মক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেছে।
তবে টিমভিউয়ারের পুরোনো প্রযুক্তিগত ভিত্তির বৈশিষ্ট্যগুলো এখনো এই প্ল্যাটফর্মে স্পষ্ট। টিমভিউয়ার ওয়ানের এন্ডপয়েন্ট ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ ও স্বয়ংক্রিয়করণ-সংক্রান্ত বিস্তৃত প্রযুক্তিসেবা শুরু থেকেই রিয়েল-টাইম রিমোট ওয়ার্কিংয়ের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।
এ ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হলো, এটি আগেভাগেই কাজের প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করতে পারে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ডিভাইস থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একত্র করে বিশ্লেষণ করা হয়। এর ফলে কোনো সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই তার লক্ষণ ও ধরন শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
চিত্র: হানেকে রোজেমুলার/দ্য গার্ডিয়ান
শ্রোটেল বলেন, এই সমন্বিত তথ্যচিত্রের মাধ্যমে আইটি কর্মীরা এবং তাঁদের এআই এজেন্টরা কোনো কর্মী অভিযোগ জানানোর আগেই সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করতে পারেন।
তিনি জানান, অনেক কর্মীই তাঁদের সমস্যার কথা আইটি বিভাগকে জানান না। তাঁদের বলা হয় ‘নীরব ভুক্তভোগী’ (সাইলেন্ট সাফারার)। ফলে পুরোনো পদ্ধতিতে অভিযোগ জানানোর ওপর নির্ভর করলে সমস্যা তৈরি হওয়ার পর তা শনাক্ত ও সমাধানের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থেকে যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, কর্মীদের সরাসরি অভিযোগ বা মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই। টিমভিউয়ার ওয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ডিজিটাল এমপ্লয়ি এক্সপেরিয়েন্স (ডিইএক্স) মনিটরিং বা কর্মীদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ।
এই ব্যবস্থায় একদিকে যেমন ডিভাইস থেকে পাওয়া পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়, অন্যদিকে কর্মীদের জরিপ, মতামত ও অভিযোগের মতো গুণগত তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এসব তথ্য একত্র করে একটি সমন্বিত মূল্যায়ন তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের সন্তুষ্টি ও কর্মক্ষেত্রে তাঁদের ভালো থাকার অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পায়। পাশাপাশি ডিজিটাল কাজের ছোটখাটো প্রতিবন্ধকতা দূর হলে কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও সন্তুষ্টি কতটা উন্নত হচ্ছে, সেটিও তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
ভবিষ্যৎকে দেখুন, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হোন
পর্যাপ্ত সময় ও তথ্য পেলে টিমভিউয়ার ওয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের কোথায় এবং কী ধরনের সমস্যা বেশি দেখা দেয়, তা শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি সম্ভাব্য সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই সেগুলোর সমাধানও প্রস্তুত করতে পারে।
তবে এআইনির্ভর কর্মক্ষেত্র নিয়ে প্রচলিত একটি উদ্বেগের বিষয়ে শ্রোটেল স্পষ্ট করে বলেন, ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়া কোনো সমাধান বা পরিবর্তন কার্যকর করা হয় না। অবশ্য কেউ চাইলে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ব্যবস্থাটি এমনভাবে কনফিগার করতে পারেন, যাতে নির্দিষ্ট কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়।
এআই একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি হলেও টিমভিউয়ারের কার্যক্রমে মানুষের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার গুরুত্ব এখনো অপরিসীম।
শ্রোটেল বলেন, ‘কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। মানুষ এখন আরও বেশি মূল্য সংযোজনকারী কাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আইটি পেশাজীবীদের প্রয়োজন এখনো রয়েছে। তবে তাঁদের দিনে ৩০ বার একই ধরনের অভিযোগের সমাধান করতে হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাঁরা এখন এআই এজেন্টের সঙ্গে একত্রে কাজ করবেন। বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করবেন, সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করবেন এবং সবচেয়ে কার্যকর সমাধান নির্ধারণ করবেন। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা তৈরি, সমস্যার সমাধান এবং তাৎক্ষণিক সহায়তার ক্ষেত্রে মানুষ ও এআই একসঙ্গে কাজ করবে। এখানে মানুষের ভূমিকা থাকছে, তবে একই সময় ও একইসংখ্যক কর্মী দিয়ে আরও বেশি কাজ করা সম্ভব হবে।’
তাহলে এআইয়ের নতুন এই সহকর্মীদের কীভাবে গ্রহণ করছেন তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পেশাজীবীরা?
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শ্রোটেল বলেন, কয়েক বছর আগে তিনি যখন বিভিন্ন ব্যবহারকারীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, সেবা প্রদানকারী কেন্দ্রের কর্মীরা এআইকে কীভাবে গ্রহণ করবেন। তাঁরা কি আশঙ্কা করবেন যে, এআই তাঁদের চাকরি কেড়ে নেবে?
কিন্তু সেদিন যেসব কর্মীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল, তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া উত্তর ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাঁদের একজন বলেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, এখন থেকে অন্তত আমাকে আর এসব কাজ করতে হবে না।’
আপনার প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগকে সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত ও সমাধানে সক্ষম করে তুলতে টিমভিউয়ার ওয়ান কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা জানুন।
