মুক্তদেশ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের বিজয়ের পর বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজধানী এবং মার্কিন কংগ্রেসে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা নতুন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। এর ফলে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণের গতি কমে যেতে পারে। অথচ চলতি বছর শেয়ারবাজারের উত্থানের পেছনে এই অবকাঠামো খাতের বড় ভূমিকা রয়েছে। সূত্র : রয়টার্স
সিনেটে সাতটি আসন, প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ৩৯টি আসন এবং গভর্নর পদে পাঁচটি আসন নিজেদের দখলে নেওয়ার দুই দিন পরই শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন ঘটে। প্রযুক্তি খাতনির্ভর সূচক নাসডাক কম্পোজিটের দরপতন হয়েছে ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত ১৯ মাসের মধ্যে এটিই সূচকটির সবচেয়ে বড় এক দিনের পতন।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটেছে এবারের নির্বাচনে। বিশেষ করে ইরানে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রিপাবলিকান-শাসিত টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, কানসাস ও আইওয়ার মতো রাজ্যগুলোতেও। এসব রাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছেন।
সিমকর্পের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তবিষয়ক গবেষণা বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান মেলিসা ব্রাউন বলেন, ‘বিনিয়োগকারীরা সম্ভবত বুঝতে পারছেন, নতুন নির্বাচিত কিছু কংগ্রেস সদস্য ও গভর্নর এআই অবকাঠামো উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিতে চান। যদিও পুরো কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না, তবে এর গতি কমে গেলেও উদ্বেগ তৈরি হবে। কারণ, এআই খাতের প্রবৃদ্ধির গল্পটি মূলত এর সহায়ক অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল।’
টেক্সাসের নবনির্বাচিত গভর্নর জিনা হিনোজোসা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা রিপাবলিকান গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন। তিনি এআই সার্ভার স্থাপনের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বাজার টেক্সাসে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরাও ডেটা সেন্টারের কারণে বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়ের চাপ থেকে সাধারণ গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে নতুন আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি এআই ব্যবস্থাগুলোর স্বাধীন ও বাধ্যতামূলক পরীক্ষার ব্যবস্থাও চালু করতে চান তাঁরা।
ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয়ের ফলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধীরা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ এআই খাতের বর্তমান উত্থানের কেন্দ্রে রয়েছে এসব ডেটা সেন্টার। এগুলোতে প্রচুর শব্দ হয়, বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয় এবং প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। ফলে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে এসব স্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।
ট্রাম্পের দপ্তর সাজানো নিয়েই ব্যস্ততা
অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার দিনের একমাত্র প্রকাশ্য কর্মসূচিতে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসকে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণার লক্ষ্যে একটি নথিতে স্বাক্ষর করেন।
গত বছর ক্ষমতায় ফেরার পর ওভাল অফিসের সাজসজ্জায় সোনালি রঙের কারুকাজ, নতুন ভাস্কর্য ও চিত্রকর্ম যুক্ত করেছেন ট্রাম্প।
ভোটাররা তাঁর দলের প্রার্থীদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয় উপহার দেওয়ার দুই দিন পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘এই দপ্তরে আমাদের অনেক বিজয় এসেছে।’
শেয়ারবাজারের দরপতন কিংবা এআই খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘এই দপ্তরে কিছু ভুলও হয়েছে। তবে এখানে আমাদের অসাধারণ অনেক বিজয় রয়েছে।’
এ সময় তাঁর ডেস্কে বড় অক্ষরে ‘ভেটো’ লেখা একটি লাল টুপি রাখা ছিল।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাই আমরা এটিকে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভে পরিণত করছি। কেউ যেন এটি স্পর্শ করতে না পারে, ধ্বংস করতে না পারে কিংবা ভেঙে ফেলতে না পারে। কিছু নির্বোধ মানুষ সামান্য ভিন্ন নকশার কিছু নির্মাণের জন্য এটি ভেঙে ফেলতে পারে—তা হতে দেওয়া হবে না।’
নির্বাচনের আগে সোমবার ট্রাম্পের শেষ প্রকাশ্য কর্মসূচিতে তিনি লিংকন মেমোরিয়ালের রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কারকাজ নিয়ে কথা বলেছিলেন। আর বুধবার সাংবাদিকদের ডেকে হোয়াইট হাউসে নির্মাণাধীন নতুন বলরুম দেখান তিনি। ঐতিহাসিক ইস্ট উইং ভেঙে সেখানে এই বলরুম নির্মাণ করা হচ্ছে।
মিসিসিপি ও আলাস্কার ফলাফলের অপেক্ষা
সিনেটের আলাস্কা ও মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ফল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। এ দুটি আসনেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। ফলে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা আরও দুটি বেড়ে ৫৬-৪৪ হতে পারে।
আগামী জানুয়ারিতে নতুন সিনেট সদস্যরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসন, তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কর্মকাণ্ড তদন্তে নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ছাড় আদায়ের চেষ্টা করবেন তাঁরা।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁদের হাতে থাকবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে সেখানে ট্রাম্পের মনোনীত কাউকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন তাঁরা।
তবে এর মধ্যবর্তী সময়ে কংগ্রেসে রিপাবলিকানরাই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখছেন। তাঁদের সামনে অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আগামী ১১ ডিসেম্বরের পরও যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম চালু রাখা যায়, সে জন্য অর্থায়নসংক্রান্ত একটি বিল পাস করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদায়ী কংগ্রেসের এই সময়টিকে (লেম ডাক পিরিয়ড) কাজে লাগিয়ে রিপাবলিকানরা নিজেদের রক্ষণশীল রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারেন।
