মুক্তদেশ ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম) একের পর এক ঐতিহাসিক বিজয়ের ঘটনা ঘটেছে। বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক নানা বাধা ভেঙে রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছেন একাধিক প্রার্থী। তাঁদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন অধ্যায়।সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের যেসব অর্জন ইতিহাস হয়ে থাকবে, তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো—
১. যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর
আটলান্টার সাবেক মেয়র কিশা ল্যান্স বটমস জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান ধনকুবের রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আটলান্টার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নানা বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন বটমস। তাঁর মেয়র থাকাকালে শহরটিতে সহিংস অপরাধের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবে গভর্নর পদে নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন।
বটমস জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি এবং প্রথম নারী হিসেবেও ইতিহাস গড়েছেন।
২. যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য
মিশিগানের বহুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন আবদুল এল-সাইয়েদ। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময়জুড়েই তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। মাইক রজার্সের পাশাপাশি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে তাঁর পরিচয়কে লক্ষ্য করে সমালোচনা করেছেন।
৩. ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম নির্বাচিত লাতিনো গভর্নর
জেভিয়ার বেসেরা ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত লাতিনো গভর্নর হয়েছেন।
শুরুতে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে থাকলেও ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থীদের ভিড় ঠেলে প্রাথমিক নির্বাচনে নিজের অবস্থান শক্ত করেন বেসেরা। রাজ্যটিতে ডেমোক্রেটিক দলের শক্ত অবস্থানের কারণে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ও রক্ষণশীল ভাষ্যকার স্টিভ হিলটনের বিরুদ্ধে তাঁর জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল।
মেক্সিকান অভিবাসী পরিবারের সন্তান বেসেরা এমন একটি অঙ্গরাজ্যের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন, যেখানে ৪০ শতাংশের বেশি বাসিন্দা নিজেদের লাতিনো পরিচয়ের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেন।
৪. টেক্সাসের প্রথম লাতিনা নারী গভর্নর
অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন তিনি।
এর মধ্য দিয়ে টেক্সাসের প্রথম লাতিনা নারী গভর্নর হওয়ার পাশাপাশি ১৯৯০ সালের পর প্রথম ডেমোক্র্যাট হিসেবে এই পদে নির্বাচিত হয়েছেন হিনোজোসা।
নির্বাচনী প্রচারের শুরুতে তাঁর প্রচারণা খুব একটা গতি পায়নি। অর্থের দিক থেকেও গ্রেগ অ্যাবটের তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন তিনি। তবে পরে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন হিনোজোসা।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টি তিনি নির্বাচনী প্রচারে বিশেষ গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করেন। তাঁর এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে অ্যাবটও সমালোচনার মুখে পড়েন।
৫. যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেব হালান্ড নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন।
মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভোটারদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
হালান্ড লেখেন, ‘আপনারা এমন একটি ভবিষ্যৎ বেছে নিয়েছেন, যেখানে নিউ মেক্সিকো সবার আগে থাকবে, কর্মজীবী পরিবারগুলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে এবং প্রত্যেক নিউ মেক্সিকোবাসীর কণ্ঠস্বর শোনা হবে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘আপনি আমাকে ভোট দিয়ে থাকুন বা না থাকুন, আমিও সব সময় আপনার গভর্নর থাকব। কারণ এই নির্বাচনী প্রচার ছিল আমাদের সবার জন্য এবং আমাদের প্রাপ্য ভবিষ্যতের জন্য।’
হালান্ড লেগুনা পুয়েবলো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য।
৬. ফ্লোরিডার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর
রিপাবলিকান প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডস ফ্লোরিডার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হতে যাচ্ছেন। মেয়াদের সীমা পূর্ণ হওয়ায় রন ডিস্যান্টিসের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি।
তিন মেয়াদে কংগ্রেস সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডোনাল্ডসের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নির্বাচনী প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে প্রধান প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তবে ইরানের সঙ্গে অজনপ্রিয় যুদ্ধ এবং এর জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন তিনি।
৭. যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সদস্য
নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রতিনিধি ক্রিস পাপাস যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি সিনেটের প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ সদস্য হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন।
বিজয় উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে জীবনসঙ্গী ভ্যান বেন্টলির উপস্থিতিতে ট্রাম্প, ইলন মাস্কসহ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জন সুনুনুকে সমর্থন দেওয়া ব্যক্তিদের কঠোর সমালোচনা করেন পাপাস।
তিনি বলেন, ‘মাসের পর মাস ধরে প্রতিদিন তারা আমাদের বিরুদ্ধে অর্থ ঢেলেছে, আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপন চালিয়েছে এবং নির্লজ্জ মিথ্যাচার করেছে। কিন্তু তারপরও আমরা তাদের হারিয়েছি, তাই না?’
৮. সিনেটে প্রথম আদিবাসী নারী সদস্য
মিনেসোটার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পেগি ফ্লানাগান যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম আদিবাসী নারী।
তিনি ওজিবওয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং হোয়াইট আর্থ নেশনের অন্তর্ভুক্ত।
৯. উইসকনসিন ও নেভাডায় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর
উইসকনসিনের গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেভিড ক্রাউলি। এর মধ্য দিয়ে তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হয়েছেন।
তাঁর এই জয় এসেছে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে। গ্রীষ্মে একবার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন ক্রাউলি। পরে বিদায়ী ডেমোক্রেটিক গভর্নর টনি এভার্সের অনুরোধে আবারও নির্বাচনে ফেরেন তিনি। অন্যদিকে, তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী টম টিফানি নির্বাচনী প্রচারে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেন।
এদিকে, নেভাডায় রিপাবলিকান গভর্নর জো লোম্বার্ডোকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী অ্যারন ফোর্ড। এর মধ্য দিয়ে তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হয়েছেন।
এর আগে নেভাডার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা এবং অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন ফোর্ড।
১০. ওহাইও, মিনেসোটা ও টেনেসিতে প্রথম নারী গভর্নর
ওহাইওর গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটন। এর মধ্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী গভর্নর হয়েছেন তিনি।
মিনেসোটায় রিপাবলিকান দলের রাজ্য প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার লিসা ডেমুথকে হারিয়ে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী অ্যামি ক্লোবুচার। তিনিও অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী মার্শা ব্ল্যাকবার্ন টেনেসির গভর্নর নির্বাচিত হয়ে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী গভর্নর হয়েছেন।
