মুক্তদেশ ডেস্ক: কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত এক ডজন বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। এসব হামলায় যত নাবিক নিহত হয়েছেন, ইরান যুদ্ধের সময়ও তার চেয়ে কম নাবিকের মৃত্যু হয়েছে।
রাশিয়ার লক্ষ্য ইউক্রেনের বন্দর দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা। এসব বন্দর দিয়ে দেশটির প্রায় সব শস্য রপ্তানি হয়। তবে রাশিয়ার কিছু হামলা উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটের (ন্যাটো) দুই সদস্যদেশ রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার উপকূলীয় জলসীমার কাছাকাছি, এমনকি জলসীমার ভেতরেও হয়েছে।
কৃষ্ণসাগর ও এর সঙ্গে যুক্ত আজভ সাগরে রাশিয়ার বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতে ইউক্রেনের কয়েক মাস ধরে চালানো হামলার পর রাশিয়া এই অভিযান শুরু করে। গত এক মাসে হামলার মাত্রা আরও বেড়েছে।
জাহাজ চলাচল ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি ঘটনায় রাশিয়া একই সঙ্গে সমুদ্র ও আকাশপথে ড্রোন ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি তারা জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে। এসব ড্রোন তুলনামূলক দ্রুতগতির এবং প্রতিহত করা কঠিন। এ ছাড়া চলন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ড্রোনও ব্যবহার করছে রাশিয়া।
সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এবং রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হামলার এই ঢেউয়ে অন্তত ৩০ জন নাবিক নিহত হয়েছেন অথবা নিখোঁজ রয়েছেন।
সর্বশেষ হামলায় গত সপ্তাহে রোমানিয়ার একটি বন্দরের দিকে যাওয়ার সময় একটি কনটেইনারবাহী জাহাজে তিনটি ড্রোন আঘাত হানে। ফ্রান্সের একটি নজরদারি বিমান থেকে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সামুদ্রিক ড্রোন জাহাজটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জাহাজটির নাম ‘কনটশিপ জেট’। পরে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, জাহাজটি একদিকে কাত হয়ে প্রবলভাবে হেলে পড়ছে। একপর্যায়ে সেটি ডুবে যায়।
হামলার সময় জাহাজটি বুলগেরিয়ার উপকূল থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার (১৫ মাইল) দূরে ছিল।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, হামলার এই বৃদ্ধি ‘কৃষ্ণসাগরকে বেসামরিক জাহাজ চলাচলের জন্য বিপজ্জনক অঞ্চলে পরিণত করছে’।
গত গ্রীষ্মে রাশিয়া ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোতে, বিশেষ করে ওদেসায়, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়িয়ে দেয়। ইউক্রেন সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টন গম রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ৫০ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গম রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এরপর ইউক্রেনীয়রা রপ্তানি কার্যক্রম দানিউব নদীর তীরবর্তী ছোট বন্দরগুলোতে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। নদীটি রোমানিয়ার সঙ্গে সীমান্ত তৈরি করেছে। কিন্তু রাশিয়ার ড্রোন সেখানেও হামলা চালাতে শুরু করে।
একের পর এক জাহাজে হামলা, প্রাণ হারাচ্ছেন নাবিকেরা
গত অক্টোবরের শুরুতে হামলার মাত্রা বাড়তে শুরু করে। ওই সময় মিসর থেকে রোমানিয়ার সুলিনা বন্দরের দিকে যাওয়ার পথে তুরস্কের মালিকানাধীন ‘আলফা ওয়াতান’ জাহাজটি আকাশ ও সমুদ্রপথে ড্রোন হামলার শিকার হয়। এতে সিরিয়ার নয়জন এবং মিসরের একজন নাবিক নিহত হন। পরে জাহাজটি ডুবে যায়।
এর ছয় দিন পর বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে রাতে হামলার শিকার হয় ‘এইচএস ডিগনিটি’ নামের আরেকটি জাহাজ। এতে ১১ জন নাবিক নিহত হন। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন সিরিয়ার নাগরিক।
সিরিয়ার নাবিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনের কর্মী মোহাম্মদ হাজ্জুজ সিএনএনকে বলেন, ‘ডিগনিটি’ জাহাজে প্রথম হামলার পর নাবিকেরা একটি চালকবিহীন সামুদ্রিক যানকে জাহাজটির দিকে এগিয়ে আসতে দেখেন। পরে সেটি জাহাজে আঘাত হানে।
লাইফবোটগুলো পুরোপুরি পানিতে নামানো সম্ভব না হওয়ায় নাবিকেরা পানিতে ঝাঁপ দেন।
হাজ্জুজ বলেন, ‘তাঁরা একে অপরকে ডাকতে শুরু করেন এবং একত্র হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমুদ্র ছিল উত্তাল এবং পানি ছিল প্রচণ্ড ঠান্ডা। ফলে নাবিকেরা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।’
বিপদ বাড়তে থাকলেও কিছু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এখনো কৃষ্ণসাগরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
হাজ্জুজ বলেন, ‘অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নাবিকেরা বিপজ্জনক এলাকায় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কখনো কখনো তাঁদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের প্রলোভন দেখানো হয়। আবার অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় এসব এলাকায় কাজ করা ছাড়া উপায় থাকে না।’
গত ১৫ অক্টোবর আরও চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়। এর মধ্যে রোমানিয়ার জলসীমা ও দেশটির একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলও ছিল। এসব হামলায় আটজনের প্রাণহানি ঘটে বলে জানিয়েছেন রোমানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওনা-সিলভিয়া তোইউ।
সুলিনা খালের কাছাকাছি দুটি রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার ‘ওয়াইন ট্রেডার’ ও ‘ইয়ারা জে’ হামলার পর আগুন ধরে যায়। এই খাল কৃষ্ণসাগরকে দানিউব নদীর সঙ্গে যুক্ত করেছে।
‘ওয়াইন ট্রেডার’ জাহাজটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে তিনটি ড্রোন আঘাত হানে। এতে বেনিনের ছয়জন এবং রাশিয়ার একজন নাগরিক নিহত হন।
জাহাজ চলাচলবিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের সামুদ্রিক বিশ্লেষকেরা বলেন, ‘রুশ বাহিনী ইউক্রেনের বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। এখন ন্যাটোর দুটি সদস্যদেশের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরেও এসব হামলা হচ্ছে।’
অ্যামব্রে আরও বলেছে, ‘রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার জলসীমাকে আর স্বাভাবিকভাবে নিরাপদ বলে বিবেচনা করা উচিত নয়।’ প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, বেশ কয়েকটি জাহাজকে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
মস্কো সব হামলার কথা স্বীকার করেনি। তবে কয়েকটি ঘটনায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, লক্ষ্যবস্তু করা জাহাজগুলোতে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য’ বহন করা হচ্ছিল।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া বিচ্ছিন্ন
রাশিয়ার হামলার বিষয়ে ইউরোপের প্রতিক্রিয়া এখনো সমন্বিত নয়। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেছেন, জোটের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা ইতিমধ্যে জোরদার করা হয়েছে। রাশিয়ার হামলা ন্যাটোর সীমান্তের আরও কাছে চলে আসায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মস্কোর সঙ্গে তুলনামূলক ভালো সম্পর্ক থাকা বুলগেরিয়ার সরকার প্রথমদিকে রাশিয়াকে সরাসরি দায়ী করতে অনীহা দেখিয়েছে। তবে এখন দেশটি ও রোমানিয়া নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করছে বলে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বুলগেরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিমিতার স্তোয়ানভ জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে দেশটি ন্যাটোর কাছে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা মোতায়েনের অনুরোধ জানিয়েছে। বুলগেরিয়া ন্যাটোর ড্রোনবিরোধী উদ্যোগেও যুক্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে রোমানিয়া উপকূলীয় এলাকায় এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের টহল শুরু করেছে। অক্টোবরের শেষ দিকে এসব যুদ্ধবিমানের একটি রোমানিয়ার জলসীমার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া রাশিয়ার সর্বাধুনিক প্রজন্মের দুটি ড্রোন ভূপাতিত করে।
রোমানিয়া জানিয়েছে, কৃষ্ণসাগরে নজরদারি সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রের মাইন ও ড্রোন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের কার্যক্রমও ত্বরান্বিত করা হবে।
তবে এসব পদক্ষেপেও জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আশ্বস্ত করা যাচ্ছে না। ইউক্রেনের বন্দরগুলোতে জাহাজের যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির কারণে বিমার খরচও অনেক বেড়েছে।
গত মাসে লন্ডনের বিমা বাজারের ঝুঁকি মূল্যায়নকারী সংস্থা জয়েন্ট ওয়ার কমিটি কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের প্রায় পুরো এলাকাকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে তুরস্ক, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও জর্জিয়ার আঞ্চলিক জলসীমা এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।
বিশ্ব খাদ্যব্যবস্থায় প্রভাবের আশঙ্কা
বিমার বাড়তি খরচ ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য বড় দুঃসংবাদ। দেশটির মোট কৃষিপণ্য রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বিশ্বের মোট ভুট্টা রপ্তানির প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গম রপ্তানির প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ করে ইউক্রেন। দেশটি বিশ্বের শীর্ষ সূর্যমুখী তেল রপ্তানিকারকও।
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল কৃষ্ণসাগরকে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। গত মাসে তিনি বলেন, ‘রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবনধারণের অন্যতম অবলম্বনকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।’
অন্যদিকে জাহাজে হামলার ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন উভয় পক্ষকেই দায়ী করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মাসে বলেন, ‘আমাদের কাছে মার্কিন কোম্পানিগুলো ফোন করে বলছে, ইউক্রেনের হামলার শিকার ওই জাহাজে আমাদের তেল ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না ইউক্রেন ইচ্ছাকৃতভাবে জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। কিন্তু জাহাজগুলোতে হামলা হয়েছে।’
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট অ্যান্টনি’স কলেজের ডারেনডর্ফ প্রোগ্রামের পরিচালক দিমিতার বেচেভের মতে, ন্যাটো ও কৃষ্ণসাগরীয় দেশগুলোকে ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার আকাশসীমা এবং স্থলভাগে ন্যাটোর উপস্থিতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বেচেভ সিএনএনকে বলেন, ‘সমুদ্রপথে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তুরস্ক, রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ‘ট্রেঞ্চ আর্ট’ ব্লগের লেখক ডেভিড অ্যাক্সের মতে, ইউক্রেন ও রাশিয়া একে অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ঠিকই, কিন্তু কেউই দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুবিধা অর্জন করতে পারছে না।
এর ফলে কৃষ্ণসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
