মুক্তদেশ ডেস্ক: ইরানের কেশম দ্বীপে সোমবার সীমিত পরিসরে হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তিন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, এটি ছিল প্রতিরক্ষামূলক অভিযান। ওই অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনা ও সামরিক সম্পদ সুরক্ষিত রাখতেই এ হামলা চালানো হয়েছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, একটি মার্কিন উড়োজাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের গুলিবর্ষণের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়েছে। তবে এটিকে কর্মকর্তারা যে বড় ধরনের সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা করে আসছিলেন, তেমন কিছু বলে মনে হচ্ছে না। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো এ অভিযান সম্পর্কে খবর প্রকাশ করা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এর আগেও একই ধরনের কয়েকটি হামলা গোপনে চালানো হয়েছিল।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানিরা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করছিল। এর জবাবে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে।’
তবে নির্বাচনের আগের দিন নতুন এই সামরিক পদক্ষেপ মনে করিয়ে দিচ্ছে, ইরান পরিস্থিতির এখনো কোনো সমাধান হয়নি। দেশটিতে আবারও সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি রয়ে গেছে।
কেশম দ্বীপে হামলা
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষামূলক এই পদক্ষেপকে বড় করে দেখানো এড়াতে মার্কিন প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে হামলার বিষয়টি গোপন রেখেছিল। তিনি আরও বলেন, মার্কিন সামরিক সম্পদ সুরক্ষিত রাখাই ছিল হামলার উদ্দেশ্য।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে কেশম দ্বীপে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কাছের হেঙ্গাম দ্বীপের বাসিন্দা এবং হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের লোকজনও বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন।
বন্দর আব্বাস থেকে প্রায় ১৪ মাইল দূরে অবস্থিত কেশম দ্বীপ ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় দ্বীপটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। চলমান যুদ্ধের আগেও যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটিতে হামলা চালিয়েছিল।
এ হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা এখনো চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, একটি চুক্তি ‘হতে পারে’।
সোমবার রাতে ফক্স নিউজে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ইরানে নতুন করে হামলার খবর নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি ট্রাম্প। তবে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা চালাতে হতে পারে’। ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা। ইসরায়েলের বিশ্বাস, তেহরান সেখানে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের একটি অংশ এবং উন্নত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেন্ট্রিফিউজ সংরক্ষণ করেছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘এটি বড় কোনো বিষয় নয়। আমরা আক্ষরিক অর্থেই এক ঘণ্টার মধ্যে এটি করতে পারি। ঠিক আছে, আমরা যখন চাইব, যেকোনো সময় এটি করতে পারব।’
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একাধিকবার হামলার সম্ভাবনার কথা বলেছেন ট্রাম্প। গত জুলাইয়েও তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব শিগগিরই’ পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে হামলা চালাতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গত শনিবারও সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানো হলে তার জবাব দেওয়া হবে ‘ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই’।
এদিকে তেহরানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইরান পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে শুধু তেল স্থাপনাকেই লক্ষ্যবস্তু করবে না; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট (এআই) অবকাঠামোসহ অন্যান্য স্থাপনাও তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না। তবে নির্বাচনের পর আবার হামলা শুরু হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বেড়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো লড়াই হয়নি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা কোনো যুদ্ধ করছি না। সবাই বলছে, আপনারা যুদ্ধে আছেন! কিন্তু আমরা সর্বশেষ কবে কোনো কিছুতে গুলি চালিয়েছি? এটি কোনো যুদ্ধ নয়—এটি খুবই সীমিত পর্যায়ের যুদ্ধ। এখানে চলমান কোনো যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি নেই। তবে তারা যদি চুক্তিতে না আসে, তাহলে পরিস্থিতি এমন হতে পারে। কিন্তু তারা খুব করেই একটি চুক্তি করতে চায়। আমাদের চুক্তিতে পৌঁছানোর যথেষ্ট ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।’
সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধের অবসান ঘটানোর পথ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘কিছুটা অগ্রগতি’ হয়েছে।
ভ্যান্স বলেন, ‘ইরানিরা সব সময়ই কিছুটা অনিশ্চিত আচরণ করে। প্রেসিডেন্ট যেমনটা সব সময় বলে থাকেন, তাঁর হাতে সামরিক ও অ-সামরিক—দুই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগই রয়েছে। তবে আমরা অবশ্যই কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছি। দেখা যাক, আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে পারি কি না।’
তিনি আরও জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে তাঁরা দুজনই ‘বেশ আশাবাদী’।
কেশম দ্বীপে হামলার পর বাড়ল তেলের দাম
কেশম দ্বীপে হামলার খবর প্রকাশের পর মঙ্গলবার এশিয়ার বাজারে দিনের শুরুতেই তেলের দাম বেড়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে বাজারে ইতিবাচক মূল্যায়নের কারণে তেলের দাম কমছিল।
তবে তেলের দাম কমার প্রবণতা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ইতিহাসের যেকোনো নির্বাচনের দিনের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পথে রয়েছে
