মুক্তদেশ ডেস্ক: ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নতুন করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে অভিযান চালানোর সময় শুক্রবার ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-এর যুব আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দীপকেকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যায় দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় একটি বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন দীপকে। আন্দোলনের সমর্থকদের ভারতীয় জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। সেই কর্মসূচির আগেই তাঁকে আটক করা হয়।
শনিবার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, ‘শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গ রোধে’ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এনডিটিভি ও ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, ওই দিন পরে তাঁকে একজন বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হবে।
‘ককরোচ’ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল গত মে মাসে অনলাইন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী সরকারের ১২ বছরের শাসনামলে অন্যতম উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
শিক্ষার্থী সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি গত এক মাসে ভারতের বড় শহরগুলোতে আন্দোলনের সমর্থকেরা রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের দাবি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের তদারকি করতে গিয়ে এমনভাবে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির সরকারকে সুবিধা দেবে। তবে নির্বাচন কমিশন ও মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের জবাবে, বিশেষ করে দিল্লিতে, কর্তৃপক্ষ কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন এবং গত সপ্তাহান্তে হাজারো মানুষকে আটক করা।
সিজেপির দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পর শুক্রবারের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিলেন দীপকে। দিল্লির যে স্থানে সম্প্রতি বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, সেখানে পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ভারতীয় পতাকা হাতে সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ করার অভিযোগে চলতি সপ্তাহে তাঁদের পাঁচ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দীপকে সিজেপি আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ‘দমনমূলক’ প্রচেষ্টার নিন্দা করেন। তিনি সমর্থকদের রাস্তায় নেমে নরেন্দ্র মোদিকে দেখিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান যে তাঁরা ভয় পান না।
তিনি বলেন, “ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর জন্য যদি কারাগারে যেতে হয়, তাহলে আমরা তার জন্যও প্রস্তুত।”
শুক্রবারের বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ আবারও কঠোর ব্যবস্থা নেয়। দিল্লির কেন্দ্রস্থলের একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার পার্কে বিক্ষোভটি হওয়ার কথা ছিল। ওই এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিক্ষোভ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়ে দীপকেকে নোটিশও পাঠানো হয়। পাশাপাশি, দিল্লির স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত পার্কটি বন্ধ করে দেয়।
দীপকে বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানালে কর্মসূচিতে যোগ দিতে লোকজন জড়ো হতে শুরু করার সময় পথে তাঁকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, সিজেপি নেতা উঁচু করে ভারতীয় পতাকা ধরে রেখেছেন। পুলিশ সদস্যরা তাঁকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলছেন, “আমি এই মুহূর্তে কোনো আইন ভঙ্গ করিনি… আপনারা আমাকে আটক করতে পারেন কীভাবে?”
তাঁকে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য ঘিরে নিয়ে যান।
আটকের পর সিজেপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেছে, “জাতীয় পতাকা হাতে তরুণদের দেখে এই সরকার এতটাই ভয় পায়।”
বিক্ষোভের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা শিক্ষার্থী নেতা নেহা বোরাকেও শুক্রবার রাজধানীর কেন্দ্রে একটি পদযাত্রা শুরু করার সময় আটক করা হয়।
আটক সত্ত্বেও বিক্ষোভ, রাস্তায় প্রায় দুই হাজার মানুষ
দীপকেকে আটক করা হলেও দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় প্রায় দুই হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হন এবং জাতীয় পতাকা মেলে ধরেন।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন ২৩ বছর বয়সী সান্না। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ওপর পুলিশের নৃশংস দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত ‘মোদি সরকারের অধীনে স্বৈরাচারের পথে এগিয়ে যাচ্ছে’।
তিনি বলেন, “আমরা শুধু শান্তিপূর্ণভাবে ভারতের জাতীয় পতাকা তুলে ধরতে এখানে এসেছি। অথচ তারা আমাদের এমনভাবে আচরণ করছে, যেন আমরা অপরাধী; গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করা নাগরিক নই।”
তিনি আরও বলেন, “জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতেই হবে। পুলিশ যা-ই করুক—আমাদের আটক করুক কিংবা মাথার খুলি গুঁড়িয়ে দিক—তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা বিক্ষোভ বন্ধ করব না।”
শুক্রবার মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও পাটনাতেও ছোট পরিসরে বিক্ষোভ হয়েছে।
‘দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চায়’—বিজেপির অভিযোগ
বিজেপির দাবি, ‘ককরোচ’ আন্দোলন এবং বিরোধী রাজনৈতিক জোট দেশে ‘নৈরাজ্য’ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিক্ষোভ করছে।
দলটির জাতীয় মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেন, “দেশে অভ্যুত্থান ঘটানোই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।”
জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শাস্তি দিতেও কর্তৃপক্ষ অস্বাভাবিক কঠোরতা দেখিয়েছে।
মুম্বাইয়ে গত সপ্তাহান্তে একটি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার সময় বলিউড অভিনেতা ইমরান খানকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁকে ভারত ছেড়ে যাওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়। মার্কিন পাসপোর্টধারী এই অভিনেতাকে চলতি মাসের শেষ নাগাদ দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে। তবে তিনি আদালতে ওই আদেশের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন।
পাঠকদের প্রতি দ্য গার্ডিয়ানের আবেদন
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে:
“আপনার কাছে আমাদের একটি ছোট অনুরোধ আছে। ২০০ বছরেরও বেশি আগে প্রকাশনা শুরু করার পর থেকে কোটি কোটি মানুষ আমাদের নির্ভীক সাংবাদিকতার ওপর আস্থা রেখেছেন। সংকট, অনিশ্চয়তা, সংহতি ও আশার মুহূর্তে তাঁরা আমাদের কাছে এসেছেন।
“বর্তমানে ১৮০টি দেশের ১৫ লাখেরও বেশি সমর্থক আর্থিকভাবে আমাদের পাশে রয়েছেন। তাঁদের সহায়তায় আমরা সবার জন্য উন্মুক্ত এবং বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারছি। আপনিও কি আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবেন?
“অনেক সংবাদমাধ্যমের মতো দ্য গার্ডিয়ানের কোনো শেয়ারহোল্ডার নেই, নেই কোনো ধনকুবের মালিক। বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ তুলে ধরার জন্য আমাদের রয়েছে দৃঢ় সংকল্প ও আন্তরিকতা। আমরা সব সময় বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে সংবাদ পরিবেশন করতে চাই। গণতন্ত্র রক্ষা, ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এ ধরনের সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
“আমরা এসব প্রতিবেদন সবার জন্য বিনা মূল্যে প্রকাশ করি। কারণ, আমরা তথ্যের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্বাসী। এর ফলে আরও বেশি মানুষ বিশ্বকে প্রভাবিত করা ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন, সেগুলোর প্রভাব ব্যক্তি ও সমাজের ওপর কীভাবে পড়ছে তা বুঝতে পারেন এবং অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রাণিত হন। অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য থাকুক বা না থাকুক, লাখো মানুষ নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত সংবাদে অবাধ প্রবেশাধিকার থেকে উপকৃত হতে পারেন।
“আপনি অল্প বা বেশি—যেকোনো পরিমাণ সহায়তা করুন না কেন, বাংলাদেশের মতো বিভিন্ন দেশের পাঠকদের সমর্থন আগামী বছরগুলোতে আমাদের সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।”
