মুক্তদেশ ডেস্ক: নিজের বাড়ির বসার ঘরে নিচু স্বরে কথা বলছিলেন আহমেদ। সিরিয়ার একটি গ্রামে তাঁর রাস্তায় ইসরায়েলি সেনাদের স্থাপন করা তল্লাশিচৌকিতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইসরায়েলের একটি কারাগারে কীভাবে তাঁকে মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।
আহমেদ বলেন, “তারা আমাকে থামায়। আমার নাম জানতে চায়, আমি কোথা থেকে এসেছি তা জানতে চায়। আমি আমার নাম ও গ্রামের নাম বলি। তখন তারা বলে, ‘তোমাকে আমাদের সঙ্গে পাঁচ মিনিটের জন্য যেতে হবে। আমরা তোমাকে আবার ফিরিয়ে দেব।’”
এরপর তিনি এক বছরেরও বেশি সময় ইসরায়েলে আটক ছিলেন বলে জানান। এর মধ্যে ৯০ দিন তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, দুই হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় তাঁকে সেলের মেঝেতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটানো হতো।
তিনি বলেন, “তারা পা দিয়ে হাতকড়ার ওপর চাপ দিয়ে সেটি আরও শক্ত করে। এতে হাতকড়া কবজির মাংসে এবং নিতম্বেও গভীরভাবে চেপে বসে। কখনো কখনো এভাবে এক বা দুই দিন আটকে রাখে, যতক্ষণ না হাত ভীষণভাবে ফুলে যায়। হাত সবুজাভ হয়ে যায়, আর আপনি হাতের কোনো অনুভূতিই পান না।”
চলতি মাসে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর বাড়ির বাইরে কয়েক ডজন মানুষ জড়ো হন। কেউ তাঁকে ফিরে আসার জন্য অভিনন্দন জানান, আবার কেউ ইসরায়েলে এখনো নিখোঁজ থাকা নিজেদের স্বজনদের সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়ার আশায় সেখানে আসেন।
আল-জাজিরা নিশ্চিত হয়েছে, অন্তত ৫১ জন সিরীয় এখনো ইসরায়েলের কারাগারে আটক রয়েছেন। তাঁদের অনেককে কুখ্যাত সদে তেইমান সামরিক কারাগারে রাখা হয়েছিল। পরে তাঁদের ইসরায়েল কারা বিভাগের পরিচালিত বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। আল-জাজিরা নিশ্চিত করেছে, সিরীয় বন্দিদের ওফের, আল-জালামা (কিশোন) ও মেগিদ্দো কারাগারে নেওয়া হয়েছে। অল্পসংখ্যক বন্দিকে মুক্তিও দেওয়া হয়েছে।
তবে মুক্তির পরও বন্দিত্বের মানসিক ক্ষত কাটিয়ে ওঠা কঠিন। ছদ্মনামে পরিচিত মাহমুদকে আল-জাজিরা যখন সাক্ষাৎকার নেয়, তখন তিনি বাড়ি ফিরেছেন মাত্র নয় দিন আগে।
মাহমুদ বলেন, “এখনো নিজেকে স্থির মনে হয় না। আমি স্বাভাবিক নই। রাতে কখনো কখনো মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি সন্তানদের দেখতে যাই, কারণ বিশ্বাসই করতে পারি না যে সত্যিই বাড়ি ফিরে এসেছি।”
গোলার শব্দে আতঙ্কিত জনপদ
মাহমুদ কথা বলার একপর্যায়ে থেমে যান। তাঁর ছয় বছর বয়সী ছেলে একটি ট্রেতে করে কাঁপতে থাকা কয়েকটি চায়ের গ্লাস নিয়ে আসে। ছেলেটি কার্পেট বিছানো মেঝেতে সাবধানে ট্রেটি রাখে। গ্লাসগুলোর ঠোকাঠুকির শব্দ হয়, কেঁপে ওঠে জানালাও। শিশুরা শব্দের উৎসের দিকে তাকায়—সেটি গোলন্দাজ কামানের আওয়াজ।
আগস্টের শুরুর দিক থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বেশির ভাগ দিনই মাঠে গোলাবর্ষণ করছে। এতে কৃষক ও রাখালেরা কাজ করতে পারছেন না। কখনো কখনো গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, আর নিয়মিত আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ইসরায়েলি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সিরীয় সংস্থা সিজিল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল ১৯৭৪ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি ২৮০ বার লঙ্ঘন করেছে। এসব লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে অনুপ্রবেশ, অভিযান, গ্রেপ্তার, কামানের গোলাবর্ষণ এবং মেশিনগান থেকে গুলি ছোড়া।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের কার্যক্রমেও বাধা
১৯৭৪ সালের চুক্তির পর থেকে ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমি ও সিরিয়ার বাকি অংশের মধ্যবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চলে জাতিসংঘের বাহিনী টহল দিয়ে আসছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের অব্যবহিত পর ইসরায়েল সিরিয়ার আরও ভূখণ্ড দখল করে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা এখনো সেখানে অবস্থান করছেন। তবে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে তাঁদের সক্ষমতা সীমিত। এদিকে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা ক্রমাগত বাড়ছে।
আগস্টের শেষ দিকে এমনই একটি ঘটনায় ইসরায়েলের দুটি ট্যাংক ও আরও পাঁচটি সাঁজোয়া যান পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত তাদের একটি ঘাঁটি থেকে নেমে আসে। এরপর জুবাতা আল-খাশাব গ্রামের কাছে জাতিসংঘের ডিসএনগেজমেন্ট অবজারভার ফোর্সের (ইউএনডিওএফ) ৩৭ নম্বর ঘাঁটিতে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি অবরোধ করে।
স্থানীয় পরিষদে কর্মরত এক ব্যক্তি জাতিসংঘের ওই ঘাঁটিতে ফোন করেন। ১৯৭৪ সালে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত শান্তিরক্ষা মিশনটির সদস্যরা সেখানে অবস্থান করেন। ফোন করে ওই ব্যক্তি জানতে চান, তাঁদের কোনো সহায়তা প্রয়োজন কি না।
ঘটনাটি স্মরণ করে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “আমার মনে হয়, তারা এতে অপমানিত বোধ করেছিল। তারা আমাকে বলেছিল, ‘না, তুমি যেখানে আছ, সেখানেই থাকো। তুমি কিংবা অন্য কেউ এখানে আসবে না। প্রয়োজন হলে আমরা অন্য ঘাঁটি থেকে সহায়তা চাইব।’”
ইউএনডিওএফ আল-জাজিরাকে নিশ্চিত করেছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কারণে তাদের সদস্যদের চলাচল এখনো মাঝেমধ্যে সীমিত হয়ে পড়ছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলের সড়কে অবরোধ ও তল্লাশিচৌকি স্থাপনের কারণে ইউএনডিওএফের পরিকল্পিত এবং ম্যান্ডেট অনুযায়ী নির্ধারিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তল্লাশিচৌকিতে কাউকে আটক করা হলে স্থানীয় বাসিন্দারা কখনো কখনো জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের সহায়তা চান। কিন্তু গভীর রাতে চালানো সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে তাঁদের করার মতো খুব বেশি কিছু নেই।
সূত্র: আল-জাজিরা
