মুক্তদেশ ডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকার স্টিবেউল নদীর ঘোলা ও মারাত্মকভাবে দূষিত পানিকে এমন একটি সম্পদে পরিণত করতে খুব বেশি কিছু লাগেনি। শুধু পাথর, তাপ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত কাঠ এবং বালির সমন্বয়ে তৈরি একটি ব্যবস্থা ব্যবহার করেই ওই পানি স্থানীয় একটি সবজি বাগানে সেচ দেওয়ার উপযোগী করে তোলা হয়েছে।
কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাজে লাগিয়ে কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা প্রতিদিন ৩৬ হাজার লিটার পানি পরিশোধন করছেন। পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য, বিভিন্ন রাসায়নিক এবং ওষুধ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বর্জ্যের সামান্য অংশে দূষিত এই পানি এখন দক্ষিণ আফ্রিকার দ্রুত সম্প্রসারিত একটি অনানুষ্ঠানিক বসতির বাসিন্দাদের খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
গবেষকদের ধারণা, জলবায়ু সংকটের সময়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই প্রকল্প একটি মডেল হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রকল্পের অন্যতম গবেষক কেভিন উইন্টার বলেন, “আমরা ওই পানি সংগ্রহ করে প্রতিদিন শোধন করছি। এখন সেই পানির কিছু অংশ সবজি উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারী ক্ষুধার্ত শিশু ও মানুষদের খাবার জোগানো সম্ভব হচ্ছে।”
দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপ অঞ্চলের স্টেলেনবোশের কাছে ল্যাংরুগ এলাকায় পরিচালিত ‘ওয়াটার হাব’ প্রকল্পের এই শোধিত পানি সম্পর্কে উইন্টার বলেন, “পানি শোধনাগারে নিয়ে ক্লোরিন দিয়ে পরিশোধনের পর যে পৌরসভার পানি পাওয়া যায়, তার সঙ্গে এই পানির পার্থক্য খুঁজে পাওয়া আপনার জন্য খুবই কঠিন হবে।”
২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প চলতি বছর এসে পানির ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণুর মাত্রা এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, যাতে তা সেচের কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে এই পানি পান করার উপযোগী নয়।
উইন্টার জানান, এই ব্যবস্থা এখন পানিতে থাকা প্রায় ৯৯ শতাংশ বিষাক্ত উপাদান অপসারণ করতে পারে। এরপর বেশির ভাগ পানি আবার নদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে আশপাশের বাস্তুতন্ত্রে পানির সরবরাহ বজায় থাকে। আর প্রায় ৩ হাজার লিটার পানি ধরে রাখা হয় ওয়াটার হাবের খাদ্য উৎপাদনকারী বাগানগুলোতে সেচ দেওয়ার জন্য।
স্টিবেউল নদীটি আবর্জনা, পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য এবং গৃহস্থালির ব্যবহৃত বর্জ্যপানিতে দূষিত।
ওয়াটার হাবের গবেষকেরা একটি পরিত্যক্ত বর্জ্যপানি শোধনাগারে তাদের প্রকৃতিনির্ভর এই ব্যবস্থা তৈরি করেছেন। সেখানে পুরোনো পানি শুকানোর বেডগুলোকে পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছে একাধিক পরিস্রাবণ বা ফিল্টারিং সেল।
এই ব্যবস্থা মূল বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে পরিচালিত হয়। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে নদী থেকে পানি পাম্প করে এসব সেলে পাঠানো হয়। এরপর পানি ধীরে ধীরে বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ দিন ধরে পরিশোধিত হয়।
প্রথমে বড় বড় পাথর পানির কণা ও রাসায়নিক পদার্থ আটকে রাখে। এরপর প্রায় ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১,৪৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় পোড়ানো কাঠ থেকে তৈরি বায়োচার ওষুধের অবশিষ্টাংশ, ফার্মাসিউটিক্যাল বর্জ্য এবং অ্যামোনিয়া শোষণ করে। সবশেষে ছোট পাথর ও বালির স্তরগুলো পানিতে অবশিষ্ট বিষাক্ত উপাদান ও দূষণকারী পদার্থ শোষণ করে নেয়।
উইন্টার বলেন, এই পরিস্রাবণ ব্যবস্থা শিল্পকারখানা বা বড় শহরের বিপুল পরিমাণ বর্জ্যপানি শোধনের জন্য প্রচলিত পানি শোধনাগারের বিকল্প হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তবে গ্রামীণ ও ছোট জনপদের মানুষের জন্য পরিষ্কার পানি সরবরাহে এটি কার্যকর হতে পারে।
২০১৮ সালে ওয়েস্টার্ন কেপ ভয়াবহ পানি সংকটের মুখে পড়েছিল। দীর্ঘস্থায়ী খরার পর ওই অঞ্চলের জলাধারগুলো প্রায় শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কয়েক মাস ধরে সেখানকার পরিবারগুলোকে পানি ব্যবহারে কঠোরভাবে রেশনিং করতে হয়েছিল। ওই সময়ে প্রায় ৩১ হাজার কৃষিশ্রমিক চাকরি হারিয়েছিলেন।
উইন্টার বলেন, “আমাদের এখন থেকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবা অত্যন্ত জরুরি। আগামী ৩০ বছরে, বিশেষ করে আমাদের এই অঞ্চলের জলবায়ু, একেবারেই ভিন্ন রকম হবে।”
তিনি বলেন, “হ্যাঁ, তখন দাবানল থাকবে, বন্যাও থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী খরার সময়ও আসবে, যখন খাদ্য ও পানির প্রাপ্যতা কমে যাবে।”
“খাদ্য উৎপাদন এবং খাদ্যনিরাপত্তার জন্য পানি সহজলভ্য করে তোলা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কৌশল হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বেই আমাদের এটি করতে হবে এবং এ বিষয়ে আরও বেশি করে শিখতে হবে,” বলেন তিনি।
