মুক্তদেশ ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের দেশগুলোকে তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করতে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমিয়ে আনতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি তাঁর প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এবং ইরানে হামলা চালানোর সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো ও যুদ্ধংদেহী বক্তব্য দেন।
ট্রাম্প বলেন, “ইরানকে পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমি সব দেশের সহযোগিতা চাইছি। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে শিগগিরই এমন একটি বিশ্ব দেখতে পাব, যেখানে ইরানের সন্ত্রাসবাদের ৫১ বছরের হুমকি আর থাকবে না… আর তেলের দাম সংঘাত শুরুর সময়ের তুলনায় আরও অনেক নিচে নেমে আসবে।”
ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক ঐক্যের আহ্বানের সময় তিনি দেশটিকে ‘ধ্বংস করে দেওয়ার’ সম্ভাবনার কথাও বলেন। তাঁর প্রশাসনের সময়ে জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির বিষয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রের বহু মিত্র অভিযোগ জানাচ্ছে, তখনই ট্রাম্প এই আহ্বান জানালেন।
‘সমঝোতা না হলে ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারি’: ট্রাম্প
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের প্রথম দিনে, নিউইয়র্কে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে আনার বিরোধিতাও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি এআইকে নতুনভাবে ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ বা ‘অতিবুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন এবং নিয়ন্ত্রণহীন এআই বিকাশের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তাকে ‘ভাঁওতা’ বলে অভিহিত করেন।
ট্রাম্প বলেন, “শিল্পবিপ্লবের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে—এমন কোনো কিছুর বিকাশ আমি থামিয়ে দেব না।”
মূলত নির্বাচনী প্রচারের সময় দেওয়া বক্তব্যের বিভিন্ন বিষয়ই আবার তুলে ধরা এই ভাষণে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ডেনমার্ক সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে দুটি নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করবে। এ নিয়ে এক বছর ধরে চলা ভূরাজনৈতিক দর-কষাকষি ন্যাটো জোটের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
দুটি ‘বড়’ সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমেরিকা মহাদেশ, ইউরোপ এবং অন্যান্য স্থানকে রক্ষার জন্য যা প্রয়োজন, তা করার পূর্ণ সক্ষমতা আমাদের থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট লিখিত অনুমোদন ছাড়া কোনো মার্কিন প্রতিপক্ষকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হবে না। সেখানে সংবেদনশীল কোনো বিনিয়োগও করতে দেওয়া হবে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে—এমন দাবি অস্বীকার করে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের কাছে এত বেশি গোলাবারুদ রয়েছে যে, আমরা যতটা ব্যবহার করতে পারব, তার চেয়েও অনেক বেশি।”
তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ‘বেপরোয়া একটি সংগঠন’ বলে আক্রমণ করেন। পাশাপাশি ইউক্রেনের যুদ্ধ অবসানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন বলেও আবার দাবি করেন।
তবে গত বছরের ভাষণের তুলনায় এবারের বক্তব্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব কিছুটা কম ছিল। গত বছর তিনি জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং অভিবাসন নীতির কারণে ইউরোপীয় মিত্রদের বলেছিলেন, তাদের দেশগুলো ‘ধ্বংসের পথে যাচ্ছে’।
মঙ্গলবারের ভাষণের একপর্যায়ে ট্রাম্প থেমে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ধন্যবাদ জানান। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে যে হামলা চালিয়েছে, তার নিন্দা করায় তিনি এই ধন্যবাদ জানান।
ইরানকে ধ্বংসের হুমকি পুনর্ব্যক্ত
ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি আবারও দেন। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে তিনি বহুবার এমন হুমকি দিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, “আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে: ইরানের সঙ্গে কি এমন একটি চুক্তি হবে, যার মাধ্যমে তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলতে পারবে? নাকি আমি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেব—এবং তা দ্রুত করব, যাতে তারা মানুষ ও মহাদেশ ধ্বংস করার সুযোগই না পায়?”
যুদ্ধ অবসানের জন্য তিনি রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন—এমন দাবি অস্বীকার করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সংঘাত নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণে মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম নির্বাচন) কোনোভাবেই প্রভাব ফেলবে না।
ট্রাম্প বলেন, “তারা অপেক্ষা করছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে আমি কী করি, তা দেখার জন্য। কিন্তু তারা যা বুঝতে পারছে না, তা হলো—আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি না। বিষয়টি আমার মনেই আসে না। একমাত্র যে বিষয়টি আমার মাথায় আছে, তা হলো—ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।”
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানির দাম
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার সংঘাতের কারণেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ইউক্রেন সফলভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর সক্ষমতায় আঘাত হানতে পারায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
কিউবাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বললেন ট্রাম্প, প্রতিবাদে অধিবেশন ত্যাগ
ভাষণে ট্রাম্প কিউবার বিরুদ্ধেও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। তিনি দেশটিকে ‘একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করেন। এ সময় কিউবার প্রতিনিধিদল অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। ট্রাম্প তখনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশটির সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
এরপর ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসন কিউবার পরিস্থিতিতে ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আনার চেষ্টা করছে।
পরে কিউবার প্রতিনিধিদলের প্রধান ব্রুনো রদ্রিগেজ ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে সেগুলোকে ‘মিথ্যা’ ও ‘মানহানিকর’ বলে অভিহিত করেন।
ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পক্ষে ট্রাম্পের সাফাই
মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের মার্কিন পদক্ষেপের পক্ষেও সাফাই দেন ট্রাম্প।
এরপর মাদুরোর উত্তরসূরি দেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে তিনি যে তেল চুক্তি করেছেন, সেটিও সমর্থন করেন। মাদুরোর উত্তরসূরি হিসেবে দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের দাবির প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখিয়েছেন। তিনি ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার চুক্তিতেও সম্মত হয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, “বিজয়ীরাই যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অধিকারী হয়।”
ট্রাম্পের নিউইয়র্ক সফরে বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তনের প্রতিফলন
ট্রাম্পের নিউইয়র্ক সফরের কর্মসূচিতে গত দুই বছরে তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে বিশ্বরাজনীতিতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের নানা দিক ফুটে উঠেছে।
ভাষণের পর ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, গ্রিনল্যান্ড রাশিয়া ও চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তবে বাস্তবে এমনটা ঘটার খুব কম লক্ষণই দেখা গেছে।
পরে ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তেহরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ডিজেলের দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দাম কমাতে সহায়তার জন্য জেলেনস্কি ও রাশিয়াকে একটি জ্বালানি-সংক্রান্ত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার বিষয়ে চাপ দিতে পারেন ট্রাম্প।
এ ছাড়া ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গেও ট্রাম্প বৈঠক করবেন। এরপর ভেনেজুয়েলার যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নেতা রদ্রিগেজের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি। ভেনেজুয়েলাও বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ।
