মহসীন কবির: দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এ দাম বাড়ানোর ফলে অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এরই মধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সমাজিক য়োগাযোগ মাধ্যমসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা ব্যাপক সমালোচনা করছেন। নানাজন তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে নানা প্রশ্ন করছেন। কেউ বলেছেন, এই মুহূর্তে তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি।
ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের বর্ধিত মূল্য কার্যকরে মধ্যরাতে পেট্টোল পাম্পগুলোয় ব্যাপক বচসা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। রাজধানী ঢাকার অনেক পাম্পে তর্ক-বিতর্ক গড়ায় হাতাহাতি এবং মারামারি পর্যন্ত।
রোববার দিবাগত রাত ১২টার পর রাজধানীর কয়েকটি পাম্প ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোনো কোনো পেট্টোল পাম্পে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ক্রেতারা।
রাজধানীর হাজি পাড়া পেট্টোল পাম্পে দেখা যায়, মোটর সাইকেলে জ্বালানি ভরতে আসা একদল যুবক পাম্পের কর্মচারীদের অশ্রাব্য ভাষায় বকাঝকা করছেন। তাদের একজন পাশ্ববর্তী রামপুরার বাসন্দা খোকন আমার দেশকে বলেছেন, রাত সাড়ে দশটায় জানলাম ১২টা থেকে সব ধরণের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে। আমি ১১টা বাজার কিছুক্ষন পর এখানে আসি পূর্বের দামে কিছু অকটেন কিনে রাখবো এই আশায়। এসে দেখি তেল বিক্রি বন্ধ। বিক্রি বন্ধ করে তারা বাড়তি দামে বিক্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মূলত এ কারণেই গ্রাহকরা ক্ষেপেছে বলে জানান খোকন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পাম্পের কর্মচারী বাবুল বলেন, আমরা ১২টা পর্যন্ত আগের দামেই তেল বিক্রি করেছি। তারপর থেকে মেশিনে নতুন দাম সেট-আপের কাজ চলছে। দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের হাত নেই উল্লেখ করে বাবুল বলেন, সরকার দাম বাড়িয়েছে। আমরা কেবল সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর করছি।
তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের টিকে থাকা চরম কঠিন বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম।
ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করার ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক কে এম শরীয়াতুল্লাহ এ সব তথ্য জানান।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং সার্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়িয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি করবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, এই বাড়তি খরচের ধাক্কা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেবে, অথচ এই চাপ সামাল দিতে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল এখনো দৃশ্যমান নয়।
ড. সেলিম রায়হানের মতে, প্রথম সতর্কবার্তা হলো—সরকারের ব্যয় ও ঋণের মারাত্মক চাপ। তিনি উল্লেখ করেন, সামাজিক সুরক্ষা ও বেতন বৃদ্ধিসহ সরকারের বিভিন্ন খাতে ব্যয় যেভাবে বাড়ছে, তা সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে এবং সেই ঘাটতি মেটাতে সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বিপজ্জনকভাবে বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, জনগণ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি-গ্যাস সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং শিল্প-কারখানার স্থবিরতায় দিশেহারা, ঠিক সেই সময়ে গভীর রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে সরকার জনগণের ওপর নতুন অর্থনৈতিক আঘাত হেনেছে। এই সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী এবং এর প্রভাব নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে কৃষি, পরিবহন ও শিল্পখাতে ব্যাপকভাবে পড়বে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের কষ্ট কমানো; কিন্তু বারবার জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলা হচ্ছে। জনগণ যখন স্বস্তি চায়, তখন তাদের ওপর নতুন বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গভীর রাতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ জনগণের সঙ্গে প্রহসনের শামিল।
মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, দেশের মানুষ আজ বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, হত্যা, অপহরণ ও অপরাধের ঘটনায় জনমনে অস্থিরতা রয়েছে; অন্যদিকে শিল্প ও উৎপাদন খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। এমন বাস্তবতায় সরকারের দায়িত্ব ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু সরকার জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার পরিবর্তে নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
মধ্যরাতে বাড়ানো জ্বালানী তেলের মূল্য প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
আজ সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই দাবী জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানী তেলের দাম এখন নি¤œমুখী। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, জ্বালানী সংকটে বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধের কারনে বেকারত্ব বৃদ্ধির মধ্যদিয়ে দেশে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এহেন সময়ে নতুন সরকার সংকট মোকাবিলায় দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে দায়িত্ব গ্রহণের ৭ মাসের মাথায় ২ দফা জ্বালানীর মূল্যবৃদ্ধির কারনে যাতায়াত, যোগাযোগ, পণ্য ও যাত্রী পরিবহনসহ শিল্প উৎপাদনে ভাড়া ও মূল্য উস্কে দেওয়ার এহেন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে ফেরত এসে জরুরী ভিত্তিতে জ্বালানী তেলের বর্ধিতমূল্য প্রত্যাহার করে পূর্বের মূল্য বহাল রাখার দাবী জানান সংগঠনটি।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সরকার জনস্বার্থে কোথাও ব্যবসা করবে, কোথাও ভর্তুকি দেবে এটাই বাস্তবতা। দেশের চরম আর্থিক সংকটের এইমুহুর্তে জ্বালানী খাতে ভর্তুকি দিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা, মূল্যস্ফীতি কমানোর মধ্যদিয়ে দেশের সংকটাপন্ন জনগণের পাশে থাকা সরকারের দায়িত্ব বলে স্মরণ করিয়ে দেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
এক যৌথ বিবৃতিতে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, এর আগেও কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ এর আগে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জনগণকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। গত মার্চেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছিলেন।
তারা বলেন, জনগণের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে মূল্যস্ফীতির বোঝা চাপাবে এবং যা জনগণকেই বহন করতে হবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।
এবি পার্টির নেতৃদ্বয় বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আগে সরকারের উচিত ছিল এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাতের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার পুরো দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে জ্বালানি খাতে অপচয়, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির চরচাকে বলেন, ‘এক লাফে জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধির চাপ সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে এবং জীবনযাত্রার সার্বিক খরচ বেড়ে যাবে।’
মো. ইসমাইল নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সন্তানদেরকে নিয়ে বেছে থাকার আশা দিন দিন কঠিন হয়ে গেছে। এই কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর দয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।’
আহসান খান নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশসহ আফ্রিকার দেশ গুলোতেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। কোনো কোনো দেশে জ্বালানি তেলের দাম ২০% থেকে শুরু করে ৫০% বা তার বেশিও বৃদ্ধি পেয়েছে।’
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জ্বালানি তেলের নতুন এই মূল্য নির্ধারণের কথা জানানো হয়। নতুন দর অনুযায়ী, ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হবে। রোববার রাত ১২টা থেকেই নতুন দর কার্যকর হয়েছে।
