মুক্তদেশ ডেস্ক: বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের নৈতিক দিক এবং মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করছে, তখন ইসরায়েল তার সামরিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এআই ব্যবহারের দিকে আরও এগিয়ে যাচ্ছে।
গাজায় সম্ভাব্য বোমা হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে এআই-ভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে সেখানে ফিলিস্তিনিদের হত্যার মাত্রা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রামাণ্যচিত্র ‘NAZA’-তেও এ বিষয়টি সম্প্রতি তুলে ধরা হয়েছে।
গাজায় যুদ্ধের পাশাপাশি দখলকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েল এআই ব্যবহার করছে বলে গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ। তাদের মতে, ফিলিস্তিনি ভূমি পর্যবেক্ষণ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির প্রক্রিয়া দ্রুত করতে এ প্রযুক্তিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম পালডিজিটাল (PalDigital) মানবাধিকারকর্মী এবং ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইসরায়েল এআই-ভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ‘ইমিসাইট’ (ImiSight) নামে একটি প্রযুক্তি রয়েছে, যা ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাফায়েল (Rafael) তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশাল এলাকাজুড়ে ভূমি পর্যবেক্ষণ এবং সেখানে পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়। পরে এসব পরিবর্তনকে বাড়িঘর বা স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
পালডিজিটালের জুলাই মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রযুক্তিটি প্রথমে ইসরায়েলের নাকাব মরুভূমিতে ব্যবহার করা হয়। সেখানে ইসরায়েলের নাগরিক ফিলিস্তিনি বেদুইনদের লক্ষ্য করে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
অনেক বেদুইন এমন গ্রামে বসবাস করেন, যেগুলো ইসরায়েলি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। এসব এলাকায় কর্তৃপক্ষ খুব কমসংখ্যক নির্মাণের অনুমতি দেয়। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপ বৈষম্যমূলক এবং এর লক্ষ্য হলো বেদুইন জনগোষ্ঠীকে ওই এলাকা থেকে সরিয়ে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা।
অনেক ক্ষেত্রে ওই প্রযুক্তি যখন কোনো স্থানের পরিবর্তনকে অনুমোদনহীন স্থাপনা হিসেবে শনাক্ত করেছে, তখন সেখানে বুলডোজার পাঠিয়ে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পালডিজিটালের তথ্য অনুযায়ী, এখন ইসরায়েল ওই প্রযুক্তি দখলকৃত পশ্চিম তীরেও ব্যবহার করছে। সেখানে বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস করা হচ্ছে। এসব ধ্বংসের ক্ষেত্রে নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ দেখানো হয়। অথচ ফিলিস্তিনিদের জন্য ওই এলাকায় নির্মাণের অনুমতি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসরায়েল ল্যান্ড অথরিটির একটি বিশেষ প্রয়োগকারী ইউনিট গঠন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনা করা। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন পিস নাউ (Peace Now) এটিকে ‘অধিগ্রহণের দিকে একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ভূমির অধিকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থা ‘অননুমোদিত দখল বা স্থাপনা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উন্নত প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে।
কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের ডকুমেন্টেশন ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান আমির দাউদ আল জাজিরাকে বলেন, এই ইউনিট প্রতিষ্ঠা একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
দাউদ বলেন, ‘আমরা এমন একটি নজরদারি ও উচ্ছেদ মডেল দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থানান্তরের কথা বলছি, যা নাকাবের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক বিপদের শুরু হচ্ছে পশ্চিম তীরে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইসরায়েল ল্যান্ড অথরিটির অধীন একটি জেলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর অর্থ হলো, দখলকৃত ভূখণ্ডের ভেতরে ইসরায়েলি বেসামরিক সরকারি ব্যবস্থাকে সরাসরি নিয়ে আসা।’
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং ইমিসাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে আল জাজিরা। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
