মুক্তদেশ ডেস্ক: ২০১৯ সালের ৩০ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার পানমুনজমে দুই কোরিয়াকে বিভক্তকারী অসামরিকীকৃত অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পেন্টাগনকে বার্ষিক যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া উলচি ফ্রিডম শিল্ড (UFS) সামরিক মহড়া আগস্টের মাঝামাঝি নির্ধারিত ১১ দিন থেকে কমিয়ে পাঁচ দিন করার নির্দেশ দেন, তখন পূর্ব এশিয়ার প্রতি তাঁর নীতির লেনদেননির্ভর যুক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সিদ্ধান্তে সিউল বিস্মিত হয় এবং পিয়ংইয়ংও পরিকল্পিতভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ছাতার ওপর ক্রমবর্ধমান সন্দেহ কীভাবে পুরো অঞ্চলের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ বদলে দিচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।
ট্রাম্প এই সময়সূচি কমানোর সিদ্ধান্তকে কিম জং উনের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরেন। কিমকে তিনি এমন একজন নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন, যাকে তিনি ‘খুব ভালোভাবে চেনেন’ এবং যার সঙ্গে তাঁর ‘খুব ভালো সম্পর্ক’ রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, এই সামরিক মহড়া পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি ‘সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও শত্রুতাপূর্ণ’ বার্তা পাঠায়। তিনি সিদ্ধান্তটির সঙ্গে সরাসরি দক্ষিণ কোরিয়ার ইরানে মার্কিন যুদ্ধ প্রচেষ্টায় যোগ না দেওয়ার বিষয়টিও যুক্ত করেন। তাঁর ভাষায়, আমেরিকা ‘সব দেশকে রক্ষা করতে পারে না, বিশেষ করে যখন তারা আমাদের সহায়তা করতে প্রস্তুত নয়।’
পিয়ংইয়ং ট্রাম্পের এই উদ্যোগের জবাব দিয়েছে অত্যন্ত হিসাব করে। কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং বলেছেন, দুই নেতার মধ্যে কোনো যোগাযোগের বিষয়ে তিনি ‘অবগত নন’। এর মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পের ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ যোগাযোগের দাবির বিরোধিতা করেন। তবে তিনি একই সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘ব্যক্তিগতভাবে ভালো স্মৃতি ও অনুভূতি’ রয়েছে বলেও জানান। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, পিয়ংইয়ং আলোচনায় আগ্রহী, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন শর্তে। ওয়াশিংটনকে উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে হবে এবং পিয়ংইয়ং যাকে ‘শত্রুতাপূর্ণ’ নীতি বলে অভিহিত করে, তা পরিত্যাগ করতে হবে।
এই দাবিগুলো ওয়াশিংটনের সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবির সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। ফলে নভেম্বর মাসে ট্রাম্প-কিম বৈঠক হলেও কোনো পক্ষ অবস্থান পরিবর্তন না করলে সেটি কেবল রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া নতুন করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনায় চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল আরও সংযত, তবে তা কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। বেইজিং এ সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সম্ভাব্য ট্রাম্প-কিম বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
তবে চীনের বৃহত্তর অবস্থান আরও স্পষ্ট হয় যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সিউল সফর করেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘প্রকৃত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অনুসরণ এবং ‘জোটভিত্তিক সংঘাত বা কোনো পক্ষ নেওয়া’ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে চীন-দক্ষিণ কোরিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সবুজ রূপান্তর ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়াং তাঁর বক্তব্যে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কোনো উল্লেখ করেননি এবং সিউলের বহুপক্ষীয় শান্তি উদ্যোগকেও সমর্থন করেননি। বরং তিনি কোরীয় উপদ্বীপে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের’ কথা বলেছেন।
এই বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, বেইজিং কোরীয় উপদ্বীপে দুটি পৃথক রাষ্ট্রের স্থায়ী বাস্তবতা মেনে নেওয়ার দিকে আরও এগিয়ে যাচ্ছে। এতদিন উপদ্বীপের কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ। উল্লেখযোগ্যভাবে, ওয়াশিংটনও যেন একই দিকে এগোচ্ছে। ২৫ আগস্ট চো হিউন ও মার্কো রুবিওর ফোনালাপের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কোনো উল্লেখ ছিল না। অথচ মাত্র ২২ জুলাই পর্যন্ত ত্রিপক্ষীয় বিবৃতিতে এই শব্দটি নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
জাপানের সামরিক উত্থান
ওয়াং ই ‘জাপানের ডানপন্থী শক্তিগুলোর ইতিহাসের গতিপথ পাল্টানোর প্রচেষ্টার’ বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘জাপানি সামরিকতন্ত্রকে আর কখনো উত্থানের সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
তাঁর এই সতর্কবার্তা টোকিওর সামরিক রূপান্তরের গতি ও ব্যাপ্তির দিকেই সরাসরি ইঙ্গিত করে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে জাপান দ্রুত এই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
ট্রাম্পের সর্বশেষ পদক্ষেপ এই পরিবর্তন শুরু করেনি, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে জাপানের আরও বেশি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের যুক্তিকে শক্তিশালী করছে।
৩১ জুলাই টোকিও ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো চালু করেছে, যার মাধ্যমে পুরো সরকারের গোয়েন্দা সমন্বয়ের ওপর প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে। জাপানের মূল প্রতিরক্ষা বাজেট বেড়ে রেকর্ড ৯ দশমিক ০৪ ট্রিলিয়ন ইয়েনে (৫৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে জাপান জানিয়েছে, বৃহত্তর প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে গেছে।
প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত নতুন করের মাধ্যমে এই সামরিক ব্যয়কে জাপানের আর্থিক নীতির সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের গতি উত্তর কোরিয়ার ক্ষোভও বাড়িয়েছে। কিম ইয়ো জং সতর্ক করে বলেছেন, জাপান কোনো ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিলে তার পরিণতি হবে ‘তাৎক্ষণিক ও টিকে থাকা অসম্ভব এমন ধ্বংসাত্মক হামলা’।
তবে বেইজিংয়ের জন্য আরও গভীর উদ্বেগ হলো—জাপানের এই স্বায়ত্তশাসনের চালনা কতটা স্বাধীনভাবে এগোচ্ছে। ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে জাপান সামরিক স্বাভাবিকীকরণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
অস্ত্র রপ্তানির নিয়ম শিথিল করা এবং মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ, কাওয়াসাকি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ ও আইএইচআই-এর মতো প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এরই ইঙ্গিত। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা অর্ডারের পরিমাণ ৬ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন (৩৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার)।
বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হতে পারে এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে দ্রুত পুনঃসামরিকীকরণ করা জাপান কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় একটি স্বাধীন বৃহৎ শক্তিতে পরিণত হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ারও কৌশল বদল
সিউলও তার কৌশল পুনর্নির্ধারণ করছে। ১৮ আগস্ট ট্রাম্প UFS মহড়া কমানোর নির্দেশ দেওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং আবারও তাঁর দেশের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধকালীন অপারেশনাল নিয়ন্ত্রণ (wartime operational control) নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করেন। পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনাও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
তাঁর যুক্তি হলো, আরও শক্তিশালী স্বাধীন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটকে আরও কার্যকরভাবে সম্পূরক করতে পারে।
নতুন ভূরাজনৈতিক ত্রিভুজ
উদীয়মান এই আঞ্চলিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে একটি ভূরাজনৈতিক ত্রিভুজ।
একদিকে এমন একটি যুক্তরাষ্ট্র, যে তার জোটগুলোকে লেনদেনের পণ্যের মতো বিবেচনা করছে। অন্যদিকে জাপান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার মধ্যে স্থায়ী সামরিক স্বায়ত্তশাসনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আর তৃতীয় দিকে রয়েছে চীন, যে নিজের আশপাশের অঞ্চলকে স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি জাপানের ডানমুখী রাজনৈতিক প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
এই ত্রিভুজের মাঝখানে পড়ে দক্ষিণ কোরিয়াকে ক্রমেই ওয়াশিংটনের অনিশ্চয়তা, বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং টোকিওর দ্রুত সামরিক উত্থানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
অনিশ্চয়তা গভীর। ট্রাম্পের পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন যদি কেবল রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে চীন ও রাশিয়ার সুরক্ষায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি আরও এগিয়ে যাবে এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ থেকে দেশটি আরও সুরক্ষিত থাকবে।
ওয়াশিংটনের সিউলের ওপর চাপ সফল হলে দক্ষিণ কোরিয়া আমেরিকার যুদ্ধগুলোতে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে—হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাত পর্যন্ত।
অন্যদিকে টোকিওর পুনঃসামরিকীকরণ যদি বাধাহীনভাবে এগিয়ে যায়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে।
নভেম্বরের এপেক সম্মেলন
নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে অনুষ্ঠেয় এপেক (APEC) সম্মেলন এই উদীয়মান নতুন ব্যবস্থার প্রথম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে।
ট্রাম্প, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতারা এবং সম্ভবত কিম জং উন একই চীনা শহরে সমবেত হলে এই অস্থিরতার কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে বেইজিং একটি বিশেষ সুযোগ পাবে।
চীন সেখানে কোনো স্থিতিশীল সমঝোতা তৈরি করতে পারবে, নাকি সম্মেলনটি পরস্পরবিরোধী জাতীয়তাবাদের আরেকটি মঞ্চে পরিণত হবে—তা আগামী দশকে পূর্ব এশিয়ার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পুরোনো নিশ্চয়তাগুলো ভেঙে পড়ছে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শতাব্দী ধরে যে মার্কিন জোটব্যবস্থা এ অঞ্চলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, সেটিই এখন ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
জাপান এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিধিনিষেধ থেকে বেরিয়ে আসছে। চীন স্থিতিশীল প্রতিবেশী অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি কোরীয় উপদ্বীপে দুটি রাষ্ট্রের স্থায়ী বাস্তবতা মেনে নেওয়ার দিকে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে শীতল যুদ্ধের পর এ অঞ্চলে যে মাত্রার অনিশ্চয়তা দেখা যায়নি, চীন এখন সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে।
কোনো একক সম্মেলন এই পরিবর্তনের চালিকাশক্তিগুলোকে থামাতে পারবে না। পূর্ব এশিয়া এমন এক নতুন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আঞ্চলিক পরিস্থিতির শর্ত নির্ধারণে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা কমছে, তার মিত্ররা নির্ভরতার সীমা পরীক্ষা করছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা পরবর্তী আঞ্চলিক ব্যবস্থা কেমন হবে তা নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
