মুুক্তদেশ ডেস্ক: মহাবিশ্বের একটি সসীম সূচনা রয়েছে, যা এর সম্প্রসারণ ও বিকাশের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। এই অনাদি-অনির্ভর কারণ এবং সবকিছুর উৎস হলেন আল্লাহ—মহাবিশ্বের প্রতিপালক ও স্রষ্টা। আল্লাহই যেহেতু এই মহাবিশ্বের উৎস এবং এর সবকিছুর মূল কারণ, তাই এই মহাবিশ্বের আগে অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
আল্লাহ—যিনি সবকিছুর অনাদি কারণ ও উৎস—তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের অধিকারী:
- অসীম, সর্বদা বিদ্যমান ও স্বয়ংসম্পূর্ণ: আল্লাহ স্বয়ং অস্তিত্বশীল। তাঁর সৃষ্টির সবকিছুই তাঁর ওপর নির্ভরশীল এবং তাঁর উপস্থিতি ছাড়া তারা অস্তিত্বশীল থাকতে পারে না।
- আল্লাহর একত্ব: তাঁর কোনো অংশীদার বা সহযোগী নেই। তিনি কোনো অংশ দিয়ে গঠিত নন; অর্থাৎ তিনি কোনো দেহ বা সীমাবদ্ধ সত্তা নন। সময় ও স্থানসহ সব ধরনের সীমা ও সীমানার ঊর্ধ্বে তিনি।
- পরম গুণাবলি: আল্লাহ অসীম পরিপূর্ণতার অধিকারী। তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা, প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচারসহ অসংখ্য পরম গুণ রয়েছে। এসব গুণ তাঁর সত্তা থেকে অবিচ্ছেদ্য; তিনি সেগুলো অর্জন করেননি। সমস্ত পরিপূর্ণতার উৎস আল্লাহ এবং সব পরিপূর্ণতা শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই গিয়ে সমাপ্ত হয়।
আল্লাহই সেই সত্তা, যিনি পাঁচ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধ বস্তুজগত সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য জীবিত ও জড় সত্তা। একই সঙ্গে তিনি এমন সব সৃষ্টি করেছেন, যা আমাদের বস্তুগত ইন্দ্রিয়ের বাইরে—যেমন ফেরেশতা ও জিন।
তবে সব সৃষ্টির মধ্যে মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান-বুদ্ধি, স্বাধীন ইচ্ছা এবং মহাবিশ্বের সম্পদ ও উপকরণকে কাজে লাগানোর নানা সামর্থ্য দিয়েছেন। ফলে পরিপূর্ণতার দিকে মানুষের নিরন্তর যাত্রা আবিষ্কার ও সৃজনশীলতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং মানবজাতির জ্ঞানের উৎস। তিনি মানুষকে জ্ঞান ও তথ্য দেন, যা মানুষ উপলব্ধি, অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করে। এর মাধ্যমে মানুষ উদ্ভাবন, অর্জন এবং শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মানবিক পরিপূর্ণতা অর্জনের পথে এগিয়ে যায়।
আল্লাহ তাঁর নির্বাচিত কিছু মানুষের কাছে নিম্নলিখিত উপায়ে জ্ঞান ও বার্তা পৌঁছে দেন:
- কোনো পাহাড়, দেয়াল বা পর্দার আড়াল থেকে কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে;
- এমন কোনো ফেরেশতা পাঠিয়ে, যে সরাসরি তাঁদের সঙ্গে কথা বলে;
- তাঁদের অন্তরে জ্ঞান প্রেরণ করে, যাতে সেই জ্ঞান তাঁদের অন্তর্গত হয়ে যায়।
আল্লাহ যখন আদমকে সৃষ্টি করলেন এবং মানবজাতির বিস্তার শুরু হলো, তখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজন ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে জটিল হয়ে উঠল। তখন আল্লাহ বিশেষ গুণাবলির অধিকারী কিছু মানুষকে নির্বাচন করে নবী ও রাসুল হিসেবে নিযুক্ত করেন, যাতে তাঁরা মানুষকে তাঁর বাণী প্রচার করেন, পথনির্দেশ দেন এবং আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দেন।
এভাবেই আল্লাহর নবী ও রাসুলদের ধারাবাহিকতা মানব অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠে। এই ধারা শুরু হয় নবী আদম (আ.) থেকে এবং শেষ হয় সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে।
নবী ও রাসুলদের মর্যাদা তাঁদের প্রচারিত বার্তার গুরুত্ব, তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব এবং যাদের কাছে তাঁরা প্রেরিত হয়েছেন সেই জনগোষ্ঠীর পরিধির দিক থেকে ভিন্ন ছিল। কেউ তাঁদের পরিবারের জন্য, কেউ তাঁদের নিজ সম্প্রদায়ের জন্য, কেউ কোনো জাতির জন্য এবং আবার কেউ সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। যেমন—নবী নূহ, ইবরাহিম, মূসা, ঈসা ও মুহাম্মদ (আ.) সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত নবীদের অন্তর্ভুক্ত।
ইসলাম হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্ববর্তী সব নবী ও রাসুলকে স্বীকৃতি দেয় এবং মনে করে, পরবর্তী একজন নবী তাঁর পূর্বসূরির মিশনকে সম্পূর্ণ করেন। কারণ আল্লাহ এক এবং তাঁর ধর্মও মূলত এক। পার্থক্য রয়েছে নির্দিষ্ট বিধান, পথনির্দেশের পদ্ধতি, প্রচারিত তথ্যের পরিমাণ এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে পাঁচটি ঐশী শরিয়তের কথা উল্লেখ করা হয়—নূহের শরিয়ত, ইবরাহিমের শরিয়ত, মূসার শরিয়ত, ঈসার শরিয়ত এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর শরিয়ত।
রাসুলদের মিশনের পাশাপাশি আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ঐশী গ্রন্থও মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এসব গ্রন্থ কখনো ফলক, কখনো লিখিত এবং কখনো মৌখিক আকারে মানুষের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের হস্তক্ষেপে এসব গ্রন্থ পরিবর্তিত হয়েছে বলে এই মতবাদে উল্লেখ করা হয়। তবে পবিত্র কোরআন সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ ও সর্বাঙ্গীন ঐশী গ্রন্থ এবং আজ পর্যন্ত এতে কোনো বিকৃতি বা পরিবর্তন ঘটেনি। সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজেই এটিকে সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এছাড়া কোরআনের কোনো একটি আয়াতের অনুরূপ কিছু সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহ মানুষকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। পবিত্র কোরআনকে একটি চিরন্তন মুজিজা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা তার বিপুল জ্ঞানের মাধ্যমে যুগে যুগে নতুন পথনির্দেশ প্রদান করে এবং মানবসভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়।
পবিত্র কোরআন প্রায় ৮০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তবে এগুলো মূল কোরআন নয়, বরং অনুবাদকদের উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার প্রতিফলন। ফলে অনুবাদ থেকে কোরআনের বাণী বোঝা গেলেও, অবতীর্ণ ভাষা আরবিতে তা বোঝার সমতুল্য নয়। আরবি ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইসলামের মতে, মানবজাতির প্রতি আল্লাহর ঐশী বার্তা ইসলামের মাধ্যমে পূর্ণতা ও পরিপূর্ণতা লাভ করেছে—অর্থাৎ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে ধর্মের চূড়ান্ত রূপ সম্পন্ন হয়েছে। তাই এরপর মানবজাতির আর কোনো নবী বা রাসুলের প্রয়োজন নেই।
এর পরিবর্তে ধর্মের বার্তা সংরক্ষণ ও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নবীদের উত্তরসূরিদের প্রয়োজন। তাঁরা নবীদের মতো একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবেন এবং ধর্মের বাণীকে বিকৃতি ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করে সমগ্র মানবজাতির কাছে তা প্রচার করবেন।
এই মতবাদ অনুযায়ী, অধিকাংশ নবীর অন্তত একজন উত্তরসূরি ছিলেন। তবে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বারোজন উত্তরসূরি ছিলেন, যারা একে একে আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ঐশী নেতা হিসেবে ইসলামের বার্তা বহন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন; তাঁরা নবী নন।
তাঁদের প্রথমজন হলেন ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব এবং শেষজন হলেন আল-মাহদি। তিনি গায়েব বা অন্তর্ধান অবস্থায় থাকা সেই প্রতীক্ষিত ত্রাণকর্তা, যিনি প্রতিশ্রুত সময়ে আবির্ভূত হয়ে পৃথিবীকে ন্যায়বিচারে পরিপূর্ণ করবেন।
নবী ও তাঁদের উত্তরসূরিদের মধ্যে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা আবশ্যক বলে এই মতবাদে উল্লেখ করা হয়েছে:
- পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান: সাধারণ মানুষের জ্ঞানের তুলনায় অতুলনীয় ও সম্পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া।
- নিষ্পাপতা বা অভ্রান্ততা: পাপ, ভুল, অবহেলা, বিস্মৃতি, পক্ষপাত ও ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে মুক্ত থাকা এবং নিজের প্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা।
- উন্নত নৈতিক চরিত্র: সততা, সাহস, দৃঢ়তা, ধৈর্য এবং অন্যান্য নৈতিক পরিপূর্ণতার গুণাবলি থাকা।
কখনো কোনো নবী অন্য একজন নবীর উত্তরসূরি ছিলেন, কিন্তু মর্যাদায় তিনি তুলনামূলকভাবে নিম্ন অবস্থানে ছিলেন অথবা ভিন্ন যুগে নবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উত্তরসূরিদের ক্ষেত্রে এমনটি নয়। তাঁদের নবুওয়াত ছাড়া হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মতোই আল্লাহর পক্ষ থেকে একই ধরনের পূর্ণাঙ্গ গুণ ও বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়েছে বলে এই মতবাদে দাবি করা হয়।
