মুক্তদেশ ডেস্ক: চলতি গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা অঙ্গরাজ্যের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ব্ল্যাকফিট নেশন-এর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপকরা নিনাইইস্তাকো (Ninaiistako) বা চিফ মাউন্টেন-এর পাদদেশে কয়েক ডজন বাইসন অবমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এই পাহাড়টি ব্ল্যাকফিট জাতির ১৫ লাখ একর আয়তনের রিজার্ভেশন এবং গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক-এর সীমান্তে অবস্থিত।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এমন একটি বাইসনের পাল গড়ে তোলা, যারা প্রায় সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিচরণ করবে। এটি কোনো আদিবাসী জাতির (Tribal Nation) পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রথম প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরোনো বন্যপ্রাণী পুনঃপ্রবর্তন কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এই দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলেই একসময় মাত্র কয়েকশ বাইসনে নেমে আসা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্তন্যপায়ী প্রাণী এখন বেড়ে প্রায় ৫ লাখে পৌঁছেছে।
বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে আসা
একসময় উত্তর আমেরিকার তৃণভূমিতে কোটি কোটি প্লেইনস বাইসন বিচরণ করত।
কিন্তু উনিশ শতকের শেষ দিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক শিকার চালিয়ে তাদের প্রায় বিলুপ্ত করে ফেলা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই হত্যাযজ্ঞ ছিল আদিবাসীদের জীবনধারা ও সংস্কৃতি ধ্বংস করার একটি কৌশল।
বাইসনের বর্তমান পুনরুত্থান সম্ভব হয়েছে শতাধিক বছরের সংরক্ষণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
প্রথমে আমেরিকান বাইসন সোসাইটি সরকারি সংরক্ষিত এলাকায় বাইসনের পাল গড়ে তোলার জন্য প্রচারণা চালায়। পরে এ কাজে যুক্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন সংরক্ষণ সংগঠন।
আদিবাসীদের নেতৃত্বে নতুন উদ্যোগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদিবাসী জাতি এবং কানাডার ফার্স্ট নেশনস সম্প্রদায় বাইসন পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তারা বাইসনকে শুধু একটি বন্যপ্রাণী হিসেবে নয়, বরং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে দেখছে।
বর্তমানে অধিকাংশ বাইসন বাণিজ্যিক খামারে পালন করা হলেও সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থাপনায় থাকা বাইসনের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার প্রাণীর দেখভাল করছে প্রায় ৪৫টি আদিবাসী জাতি।
ইন্টারট্রাইবাল বাফেলো কাউন্সিল-এর নির্বাহী পরিচালক মাইকেল বো ভোকু বলেন, এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের সব ফেডারেল সংরক্ষিত এলাকায় থাকা বাইসনের সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।
ব্ল্যাকফিট জনগণের কাছে বাইসনের অর্থ
ব্ল্যাকফিট জনগণ, যারা নিজেদের নিৎসিতাপি (Niitsitapi) নামে পরিচয় দেন, তাদের ভাষায় বাইসনের নাম “ইইন্নি (iinnii)”।
এই শব্দের অর্থ শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়; এটি একই সঙ্গে আত্মীয়, শিক্ষক এবং জীবনদাতা।
দশ বছর আগে কানাডার একটি জাতীয় উদ্যান থেকে ব্ল্যাকফিট জাতির কাছে প্রথম ইইন্নি আনা হয়।
এসব বাইসনের পূর্বপুরুষ ছিল একসময় ব্ল্যাকফিট অঞ্চলে বসবাসকারী একটি বন্য পাল।
তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাজে কিংবা মাংস ও চামড়ার জন্য একটি পাল সংরক্ষণ করা নয়; বরং কিছু বাইসনকে মুক্ত করে আবারও বন্য পরিবেশে স্বাভাবিক জনসংখ্যা গড়ে তোলা।
নানা চ্যালেঞ্জ
ব্ল্যাকফিট বাফেলো প্রোগ্রামের পরিচালক এরভিন কার্লসন বলেন, এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো পর্যাপ্ত জমি অন্য অনেক আদিবাসী জাতির নেই।
ব্ল্যাকফিট নেশন এমন চুক্তিও করেছে, যাতে বাইসন রিজার্ভেশনের বাইরে গিয়ে গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্ক এবং কানাডার ওয়াটারটন লেকস ন্যাশনাল পার্ক পর্যন্ত বিচরণ করতে পারে।
তবে ২০২৩ সালে প্রথমবার কিছু বাইসন ছেড়ে দেওয়ার পর কয়েকটি প্রাণী দ্রুত পাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন খামারে চলে যায়।
এতে স্থানীয় খামারিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে বাইসন তাদের গবাদিপশুর জন্য নির্ধারিত ঘাস খেয়ে ফেলবে।
ফলে মুক্তভাবে বিচরণ করা বাইসনগুলোকে আবার ধরে এনে ঘেরের মধ্যে রাখতে হয়।
নতুন আশার অপেক্ষা
এবারের অবমুক্তকরণের আগে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিগুলো ঘিরে বেড়া নির্মাণের বহু বছরের প্রকল্প শেষ করা হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হলো এমন এক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যা একসময় বেড়াবিহীন এই প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
এই সাময়িক বাধা ব্ল্যাকফিট নেতাদের অঙ্গীকারকে দুর্বল করতে পারেনি।
ব্ল্যাকফিট নেশনের মৎস্য ও বন্যপ্রাণী বিভাগের পরিচালক ব্র্যান্ডন কিটসন বলেন,
“এই প্রাণীগুলোকে যদি আবার প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় বড় দলে দৌড়াতে বা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে দেখতে পাই, তাহলে সেটি হবে অসাধারণ এক দৃশ্য। এদের প্রকৃত স্থান এখানেই।”
