মুক্তদেশ ডেস্ক: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) চিফ প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ঘিরে গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এক গোপন ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ভোটে তাকে পদচ্যুত করার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। তাকে অপসারণ করতে ১২৫টি সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত ৬৩টি দেশের সমর্থনের প্রয়োজন। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের মতো হাই প্রোফাইল মামলার প্রসিকিউটর হিসেবে পরিচিত করিম খান এসব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন।
তবে করিম খানের এই বিচার প্রক্রিয়াকে ঘিরে ভূরাজনীতি এবং আইসিসির অভ্যন্তরীণ বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির পর থেকেই ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র চাপের মুখে পড়ে আইসিসি।
ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের নিয়মকানুন পরিবর্তন এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনী ক্ষমতা নিজেদের কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালত, অঙ্গরাজ্যগুলোর কর্মকর্তা এবং ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে তারা ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে বলে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
নির্বাচনী নিয়ম নির্ধারণের আইনি ক্ষমতা মূলত অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালাচ্ছেন। সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে দুটি মূল কারণ রয়েছে; ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে হার নিয়ে তিনি ভিত্তিহীনভাবে ভোট কারচুপির অভিযোগ করেন এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস) নিয়ন্ত্রণ নিলে তাকে অভিশংসন করার কোনো কারণ খুঁজে বের করতে পারে- এমন ভীতি।
ট্রাম্পের এই চিন্তাধারার কারণে তার প্রশাসন বিচার বিভাগের আইনি নোটিশ ও হুমকি, এফবিআইয়ের অভিযান ও তদন্ত এবং অন্যান্য ফেডারেল সংস্থাকে ব্যবহার করে অঙ্গরাজ্যগুলোকে ভোটের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বাধ্য করছে। এর মধ্যে ডাকযোগে ভোটদান এবং ভোটিং মেশিনের ব্যবহার সীমিত করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। ট্রাম্প ও তার কট্টর মিত্ররা কোনো প্রমাণ ছাড়াই এগুলোকে জালিয়াতিপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়ে আসছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসন নভেম্বরের নির্বাচনের আগে নির্বাচন কর্মী ও ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে। একই সঙ্গে রিপাবলিকান প্রার্থীরা হেরে গেলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।
গত ১৬ জুলাই ২৫ মিনিটের এক টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে তাকে হারাতে চীনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, অনাগরিকদের ভোট দেওয়া এবং ত্রুটিপূর্ণ ভোটিং মেশিনসহ নানা ভিত্তিহীন ও বাতিল হওয়া অভিযোগ উপস্থাপন করেন। কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করেন, আমেরিকার নির্বাচনে হ্যাকিং, কারচুপি এবং দুর্নীতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত কয়েক মাসে বিচার বিভাগ যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্যের কাছে ভোটারদের সেন্সরবিহীন তালিকা চেয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া ২০২০ সালে জর্জিয়ায় ট্রাম্পের হারের পর সেখানকার নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এফবিআই পুনরায় তদন্ত শুরু করেছে, যা এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ। প্রশাসনের এই কঠোর কৌশল বিশেষজ্ঞ, আদালত, অঙ্গরাজ্য কর্মকর্তা এবং ডেমোক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের সদস্য এবং বিচার বিভাগের সিভিল রাইটস ডিভিশনের সাবেক অ্যাটর্নি এইলিন ও’কনর বলেন, ‘বিচার বিভাগ অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে সেন্সরবিহীন ভোটার তালিকা চেয়ে বারবার বিচারকদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তারা এমন ৩০টি মামলা দায়ের করেছিল, যার মধ্যে ১৫টিতেই হেরেছে।
তারা আরও বলেন, নির্বাচন সহায়তা কমিশনের সদস্যদের বরখাস্ত করা এবং ভোটকেন্দ্রে আইসিই এজেন্ট ও ন্যাশনাল গার্ড পাঠানোর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ইঙ্গিতগুলো বেশ উদ্বেগজনক। রিপাবলিকানদের পরাজয় এড়াতে ট্রাম্প নির্বাচন চলাকালীন ভোটগ্রহণ বা ভোট গণনায় ব্যাঘাত ঘটানোর নির্দেশও দিতে পারেন।
আইন বিশেষজ্ঞ বারবারা ম্যাককুয়েড বলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনের ছয় বছর পর, এতসব অডিট, পুনঃগণনা এবং মামলা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোট পরিবর্তনের কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। তিনি জানান, ডাকযোগে ভোট বাতিল করলে তা কেবল রিপাবলিকান প্রার্থীদেরই সুবিধা দেবে।
অনেক রিপাবলিকান নেতাও ট্রাম্পের এই আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। পেনসিলভেনিয়ার সাবেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা চার্লি ডেন্ট বলেন, ২০২০ সালের হার নিয়ে ট্রাম্প ঘোরের মধ্যে আটকে আছেন। তিনি এমন অনেক কিছুই করছেন, যা রিপাবলিকান দলের জয়ের পথকেই কঠিন করে তুলছে।
