মুক্তদেশ ডেস্ক: মা’— এই ছোট্ট শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে জন্মের আলো, নিরাপত্তার ছায়া, আত্মত্যাগের মহিমা, মমতার উষ্ণতা, শিকড়ের টান এবং অস্তিত্বের গভীরতম গল্প। মানুষের জীবনে প্রথম আশ্রয়, প্রথম স্পর্শ, প্রথম ভাষা— সবকিছুর সূচনা যেন মায়ের হাত ধরেই। তাই যুগে যুগে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়, ভাষা থেকে ভাষায় মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর নানা রীতি গড়ে উঠেছে। আধুনিক বিশ্বে সেই চিরন্তন অনুভূতিরই বৈশ্বিক প্রকাশ— বিশ্ব মা দিবস।
প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পালিত হয় মা দিবস। বাংলাদেশেও দিনটি এখন পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনে উদযাপিত হয়। তবে মা দিবসের ইতিহাস কেবল আবেগঘন ভালোবাসার গল্প নয়; এর গভীরে জড়িয়ে আছে সামাজিক আন্দোলন, প্রতিবাদ, ইতিহাস এবং এক নারীর দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনি।
মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর ঐতিহ্য আধুনিক যুগের বহু আগের। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃদেবী রিয়ার সম্মানে উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। রোমান সভ্যতায় দেবী সাইবেলিকে কেন্দ্র করেও পালিত হতো মাতৃত্বের উৎসব। পরে ইংল্যান্ডে গড়ে ওঠে ‘মাদারিং সানডে’-র ঐতিহ্য, যেদিন সন্তানরা পরিবার ও মায়ের কাছে ফিরে আসত। তবে আধুনিক মা দিবসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে।
উনিশ শতকের আমেরিকায় সামাজিক অস্থিরতার সময় নারীদের স্বাস্থ্য, শিশু পরিচর্যা ও পারিবারিক পুনর্গঠনে কাজ করতেন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হো এবং অ্যান রিভস জার্ভিস। ১৮৭০ সালে শান্তি ও মানবতার পক্ষে ‘মাদারস ডে প্রোক্লেমেশন’ প্রকাশ করেন জুলিয়া ওয়ার্ড হো। একই সময়ে অ্যান রিভস জার্ভিস নারীদের সংগঠিত করে শিশুস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল— পরিবার ও সমাজের জন্য মায়ের অবদানকে সম্মান জানাতে একটি বিশেষ দিন থাকা প্রয়োজন।
কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার আগেই ১৯০৫ সালের ৫ মে অ্যান রিভস জার্ভিস মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যু গভীরভাবে নাড়া দেয় তাঁর মেয়ে আনা জার্ভিসকে। মায়ের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন— মায়ের সেই স্বপ্ন তিনি পূরণ করবেন। এরপর শুরু হয় তাঁর নিরলস সংগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, রাজনীতিবিদ, সামাজিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি একের পর এক চিঠি লিখতে থাকেন। তাঁর একটাই দাবি ছিল— মায়েদের সম্মানে একটি জাতীয় দিবস ঘোষণা করতে হবে।
অবশেষে ১৯০৮ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের সেন্ট অ্যান্ড্রুস মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চে আনা জার্ভিস প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করেন। সেদিন অংশগ্রহণকারীদের হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন সাদা কার্নেশন— তাঁর মায়ের প্রিয় ফুল। ধীরে ধীরে দিবসটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন এবং দিনটিকে সরকারি ছুটির মর্যাদা দেওয়া হয়। এরপর বিশ্বের নানা দেশ নিজেদের সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে এই দিনটিকে গ্রহণ করে।
তবে ইতিহাসের এক গভীর বিদ্রূপ হলো— যে নারী মা দিবস প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন, তিনিই পরবর্তীকালে এর বাণিজ্যিক রূপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। আনা জার্ভিসের কাছে মা দিবস ছিল হৃদয়ের, সম্পর্কের, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার দিন। তিনি চেয়েছিলেন, সন্তানরা নিজের হাতে মাকে চিঠি লিখুক, সময় দিক, কৃতজ্ঞতা জানাক। কিন্তু খুব দ্রুত ফুলের দোকান, শুভেচ্ছা কার্ড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, উপহার ব্যবসায়ী ও করপোরেট কোম্পানিগুলো মা দিবসকে বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আনা জার্ভিস বলেছিলেন, “আমি এই দিনটি ভালোবাসার জন্য চেয়েছিলাম; ব্যবসার জন্য নয়।” এরপর তিনি ফুল ব্যবসায়ী, কার্ড কোম্পানি ও নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। জীবনের সঞ্চয় পর্যন্ত ব্যয় করেন এই লড়াইয়ে। প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ১৯৪৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে আজ মা দিবস বিশ্বজুড়ে এক জনপ্রিয় উদযাপন। তবে এর গল্প কেবল ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। একসময় মনে করা হতো, মায়ের ভূমিকা শুধু পরিবার ও সন্তান লালন-পালনের মধ্যেই সীমিত। কিন্তু বর্তমান সমাজে মায়ের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, পরিবারের মানসিক শক্তি, কর্মজীবী নারী, উদ্যোক্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং সমাজ গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন মা ভোরে উঠে পরিবারের জন্য রান্না করেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠান, আবার অফিসে যান কিংবা নিজের ব্যবসা পরিচালনা করেন। গ্রামে একজন মা সংসার সামলে কৃষিকাজে অংশ নেন; শহরে আরেকজন মা করপোরেট অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলান। অনেক পরিবারে মা-ই এখন প্রধান উপার্জনকারী।
তবুও বাস্তবতা হলো— পরিবারের অদৃশ্য শ্রমের সবচেয়ে বড় অংশের ভার এখনও মায়ের কাঁধে। কর্মজীবনের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের পড়াশোনা, ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা— সব মিলিয়ে আজকের মা প্রতিদিন নীরব এক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যান। অনেক মা আছেন, যাঁদের সন্তান দূরে থাকে; ভিডিও কলে কথা বলেই কাটে দিনের পর দিন। অনেক মা বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গ জীবন কাটান, অথচ একসময় সন্তানের প্রতিটি স্বপ্ন পূরণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন। আবার বহু একক মা সমাজের নানা বাধা উপেক্ষা করে সন্তানকে মানুষ করে চলেছেন। তবু মা থেমে থাকেন না।
উদযাপন যে দিনেই হোক, ফুল কিংবা উপহার যা-ই থাকুক— মা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটিই: পৃথিবীতে অনেক সম্পর্কের ভাষা বদলে যায়, সংজ্ঞা পাল্টে যায়; কিন্তু একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য কখনও বদলে যান না। কারণ মা শুধু একজন মানুষ নন— একজন মানুষের প্রথম পৃথিবী।
