মুক্তদেশ ডেস্ক: দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনার পর মধ্যপ্রাচ্যের দাবার বোর্ডে নতুন চাল দিয়েছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফার শান্তি প্রস্তাবের জবাবে তেহরান পাকিস্তানের মাধ্যমে তাদের ১৪ দফার পাল্টা প্রস্তাব পেশ করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৮ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র বিক্রির তোড়জোড় শান্তি প্রক্রিয়াকে এক জটিল গোলকধাঁধায় ঠেলে দিয়েছে।
ইরানের প্রস্তাবে ‘সাময়িক যুদ্ধবিরতি’র পরিবর্তে ‘স্থায়ী যুদ্ধ অবসান’-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যেখানে ওয়াশিংটন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই মাস সময় চেয়েছিল, সেখানে তেহরান মাত্র ৩০ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে কার্যত মার্কিন কূটনীতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাব পর্যালোচনার আশ্বাস, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মিত্র—ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কাছে দ্রুত অস্ত্র সরবরাহ—ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন এখনো ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি থেকে সরে আসেনি। ৮ বিলিয়ন ডলারের এই অস্ত্রচুক্তি শুধু সামরিক সহায়তাই নয়, বরং ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সরাসরি আলোচনার পরিবর্তে একটি ‘বাফার চ্যানেল’ ব্যবহার করে ইরান নিজ অবস্থানকে কৌশলগতভাবে সুরক্ষিত রাখতে চাচ্ছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির বক্তব্য অনুযায়ী, তেহরান এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে ঠেলে দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ‘শান্তিকামী’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ-অবরোধ ও ড্রোন নজরদারি সত্ত্বেও ২২০ মিলিয়ন ডলারের অপরিশোধিত তেল নিয়ে ইরানের সুপারট্যাঙ্কার ‘HUGE’ এশিয়ায় পৌঁছেছে। ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মার্চ থেকে জাহাজটি তার অটোমেটিক আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম (AIS) বন্ধ রেখে ‘ডার্ক মোড’-এ চলাচল করছিল।
এই ঘটনা মার্কিন নৌবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্য এবং তাদের স্যাটেলাইট নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইন্দোনেশিয়ার লম্বক প্রণালি ব্যবহার করে ট্যাংকারটির অগ্রযাত্রা দেখাচ্ছে, ইরান এখন প্রচলিত মালাক্কা প্রণালির বাইরে বিকল্প ও জটিল রুট ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠেছে। রাডার ফাঁকি দেওয়ার এই সক্ষমতা ইরানের নৌ-প্রযুক্তিগত দক্ষতারই প্রতিফলন।
মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরান বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারিয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অন্তত ৫২টি জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এই দাবি সত্য হলে বোঝা যায়, তেহরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্থবির হয়নি; বরং তেলনির্ভর বৈশ্বিক বাজারে তাদের উপস্থিতি বহাল রয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার অনেক দেশ এখনো তুলনামূলক কম দামে ইরানি তেলের ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৪ বছর পর আল-ইয়ারুবিয়া সীমান্ত দিয়ে ইরাকি তেলের কনভয় সিরিয়ায় প্রবেশ করেছে। এটি কেবল বাণিজ্যিক ঘটনা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ২০১১ সালের যুদ্ধ এবং ২০১৪ সালে আইএসআইএলের দখলের পর এই রুট কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল।
স্পষ্টতই ইরাক এখন হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। সিরিয়ার বানিয়াস শোধনাগারের দিকে এই তেলযাত্রা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ইরান-ইরাক-সিরিয়া—যাকে অনেক বিশ্লেষক ‘শিয়া ক্রিসেন্ট’ বা প্রতিরোধ অক্ষ বলেন—অর্থনৈতিকভাবে পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। এই করিডোর ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহের একটি বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে।
কুর্দি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে সীমান্ত পারাপার পুনরায় ইরাকি ও সিরীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসা নির্দেশ করে, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছাড়াই নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিকল্প জ্বালানি করিডোর গঠনের পথ প্রশস্ত করতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ইরানের ১৪ দফা শান্তি প্রস্তাব এবং সমান্তরালে স্থল ও সমুদ্রপথে অবরোধ ভাঙার প্রচেষ্টা বিশ্বরাজনীতিতে এক ধরনের ‘ছায়া যুদ্ধ’-এর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনায় শান্তির সম্ভাবনা, অন্যদিকে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তির বাস্তবতা—এই দ্বৈততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
আগামী ৩০ দিন মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এটি কি একটি ঐতিহাসিক সমঝোতার দিকে এগোবে, নাকি আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে নতুন অর্থনৈতিক জোট গড়ে তুলবে—তা এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে: নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের পুরোনো কৌশল দিয়ে ইরানকে পুরোপুরি কোণঠাসা করা আগের মতো সহজ আর নয়।
