মুক্তদেশ ডেস্ক: প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে বর্তমান সিরিয়া অঞ্চলে মানুষ বিটুমেন নামের তেলের উপজাত ব্যবহার করত সরঞ্জামের হাতল জোড়া লাগাতে। পরে মেসোপটেমিয়ার মানুষ নৌকা জলরোধী করতে এটি ব্যবহার করত। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান নির্মাণ এবং মিসরীয়দের মমি সংরক্ষণেও বিটুমিন ব্যবহারের প্রমাণ রয়েছে।
চীনে খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ সালেই মানুষ কাঁচা তেল ও গ্যাস পোড়িয়ে তাপ ও আলো পেত। চতুর্থ শতাব্দীতে তারা এগুলো খনন করে বাঁশের পাইপ দিয়ে পরিবহন করত।
তবে আধুনিক তেল শিল্পের সূচনা হয় ১৮৫৯ সালে, যখন এডউইন ‘কর্নেল’ ড্রেক যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় প্রায় ৬৯ ফুট গভীরে তেলের ভান্ডার আবিষ্কার করেন।
কাঁচা তেল মূলত কার্বন ও হাইড্রোজেনের অণু দিয়ে গঠিত। কোটি কোটি বছর আগে জলাভূমি, হ্রদ ও সমুদ্রের তলদেশে জমে থাকা উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ তাপ ও চাপের প্রভাবে ধীরে ধীরে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপ নেয়।
যদি হঠাৎ তেল শেষ হয়ে যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি হঠাৎ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়বে। গাড়ি, ট্রেন, জাহাজ ও উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন—সবকিছুই বিপর্যস্ত হবে।
তবে বাস্তবে তেল থেকে সরে আসার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, চলতি দশকের মধ্যেই তেলের বৈশ্বিক চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এরপর বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার বড় পরিবর্তন আনবে।
২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে আইইএ জানিয়েছে, বিশ্বে ব্যবহৃত তেলের প্রায় ৫০ শতাংশই সড়ক পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ নতুন গাড়ি হবে বৈদ্যুতিক।
বিমান ও জাহাজ শিল্পের চ্যালেঞ্জ
উড়োজাহাজ শিল্প এখনো তেলের ওপর নির্ভরশীল। তবে এখানে বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে সাসটেইনেবল এভিয়েশন ফুয়েল (SAF), যা বর্জ্য, জৈব পদার্থ, ব্যবহৃত রান্নার তেল বা প্রাণীর চর্বি থেকে তৈরি করা যায়। এই জ্বালানি প্রচলিত জেট ফুয়েলের সঙ্গে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মিশিয়ে ব্যবহার করা সম্ভব।
মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের সব বাণিজ্যিক বিমানকে SAF ব্যবহারের উপযোগী করার পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে জাহাজ শিল্পে তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয় এবং বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে।
আন্তর্জাতিক চেম্বার অব শিপিংয়ের মতে, যদি বিশ্বে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে “অর্ধেক মানুষ অনাহারে থাকবে, আর বাকি অর্ধেক ঠান্ডায় জমে যাবে।”
প্লাস্টিক: তেলের আরেক বড় সমস্যা
তেলের আরেক বড় ব্যবহার পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে। বর্তমানে উৎপাদিত তেলের প্রায় ১২ শতাংশ ব্যবহার হয় প্লাস্টিক, সার, কাপড়, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ডিটারজেন্ট ও টায়ার তৈরিতে।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক শত শত বছর ধরে পরিবেশে থেকে যায় এবং পরে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে সমুদ্র, পাহাড় এমনকি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে।
ম্যাকডোনাল্ডের মতে, “তেলের শিল্পের সবচেয়ে বড় বিপদ অনেক সময় জ্বালানি নয়, বরং প্লাস্টিক।”
তেল-যুগের শেষের শুরু
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পৃথিবীতে তেলের ঘাটতির কারণে তেল শিল্প ধসে পড়বে না। বরং একসময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি এত সস্তা হয়ে যাবে যে তেল উত্তোলন আর লাভজনক থাকবে না।
গবেষক ফেমকে নিসের মতে, ২০৬৫ সালের মধ্যে বিশ্বের তেল ব্যবহার প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তবে উড়োজাহাজ ও জাহাজ শিল্প কিছুটা নির্ভরশীল থেকে যেতে পারে।
অনেকের মতে, একসময় তেল উত্তোলনের বিশাল টাওয়ারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো স্বর্ণখনির মতোই ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে—একটি হারিয়ে যাওয়া যুগের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।
