মুক্তদেশ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ছড়ানো গুজবে দেশের পেট্রল পাম্প ও তেলের ডিপোগুলোয় অস্বাভাবিক ভিড় দেখা গেছে। সাধারণ ক্রেতারা আতঙ্কিত হয়ে আগেভাগে গাড়িতে ট্যাংকভর্তি করে তেল নিচ্ছেন। ফলে কিছু পাম্পে বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। রাজধানীর মালিবাগ, তেজগাঁও, নিউমার্কেট, আসাদগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যানবাহনের সারি সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
তেলের চাহিদা এতটা বেড়ে গেছে যে, মার্চে ডিজেলের বিক্রি আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। অকটেন ও পেট্রলের চাহিদাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। তেলের সরবরাহ সামলাতে বিপিসি কিছু পাম্পে বিক্রি সীমিত করেছে। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং এরই মধ্যে দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে, আরও জাহাজ আসছে। ফলে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
নারায়ণগঞ্জের পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপোতে সরবরাহ কমানো এবং পরিদর্শনের কারণে ট্যাংকলরির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাবকে কেন্দ্র করে পাম্প মালিক ও এজেন্টরাও আগে থেকে বেশি করে তেল সংগ্রহ করছেন।
এদিকে এলপিজি আমদানিকারকরা দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর আগ্রহ দেখালেও বিপিসি জানিয়েছে, আগেভাগে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। মূল্যের নির্ধারণ শুধু আমদানির খরচের ভিত্তিতে হবে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভবিষ্যতে সরবরাহের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মালিবাগ মোড়ের ফিলিং স্টেশনে রাইড শেয়ারিং চালক আওলাদ বলেন, সাধারণত দিনে দুই থেকে তিনবার অকটেন নেন। কিন্তু লোকজন বলছে দুই দিন পর তেল পাওয়া যাবে না। তাই পুরো ট্যাঙ্ক ভরেছেন। এই পাম্পের ম্যানেজার নজরুল আলম বলেন, সাধারণত তাদের কাছে ২০ থেকে ২৭ হাজার লিটার তেল মজুদ থাকে, কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদায় তা দ্রুত কমে গেছে। তাই আপাতত শুধু গাড়িতে তেল দেওয়া হচ্ছে। নিউমার্কেট এলাকার একটি পাম্পের কর্মীরা জানান, গত বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত গাড়ির চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি ছিল। মজুদ কমে যাওয়ায় গতকাল বেলা ১০টা থেকে ১১টার পর অনেক পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তেজগাঁওয়ের একটি পাম্পের কর্মী আমিনুল গতকাল দুপুরে বলেন, ডিপো থেকে গাড়ি আসছে না। মজুদ কমে গেছে। তাই বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুজবের কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়াই মূলত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, মার্চের ১৪ তারিখ ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৯৫ হাজার টন, যেখানে গত বছর একই সময়ে বিক্রি হয় ৪৫ হাজার টন। অকটেন ও পেট্রলের বিক্রিও বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে গোদনাইল এলাকায় পদ্মা ও মেঘনা অয়েল ডিপোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিপোতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অনেক ট্যাংকলরির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এবং সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় ডিপোর ভেতর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ট্যাংকলরির লাইন নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় পেট্রল পাম্প মালিক ও এজেন্টরা বেশি করে তেল সংগ্রহ করতে লরি নিয়ে ডিপোতে ভিড় করছেন। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট হতে পারেÑ এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ায় তেলের চাহিদাও বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন তারা।
গোদনাইলের মেঘনা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পাম্প মালিকদের ২০ শতাংশ এবং এজেন্টদের ৫০ শতাংশ কম তেল দিতে হচ্ছে। ডিপোতে পর্যাপ্ত তেল মজুদ রয়েছে, সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। তবে পরিদর্শন কার্যক্রমের কারণে সরবরাহে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় ট্যাংকলরির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
একই এলাকার পদ্মা অয়েল ডিপোর ব্যবস্থাপক আমিনুল হকও বলেন, ডিপোতে তেলের মজুদ স্বাভাবিক রয়েছে।
বর্তমানে ডিজেল ১০ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রল ১৩ দিন, ফার্নেস ৯০ দিন ও জেড ফুয়েল ৫২ দিনের মজুত রয়েছে। বিপিসি জানিয়েছে, ৩০ হাজার ও ২৭ হাজার টন জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে এসেছে। আরও জাহাজ আসছে। হরমুজ প্রণালির কারণে সৌদি আরবে দুটি জাহাজ আটকে গিয়েছিল। সেজন্য ইউপ্যাককসহ কয়েকটি কোম্পানিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে দাবি বিপিসির। সংস্থাটির একটি সূত্র জানিয়েছে চুক্তিবদ্ধ কোম্পানিগুলো যুদ্ধ সংকটকে পুঁজি করে প্রিমিয়াম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে গতকাল এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বৈঠক করেছেন। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, এলপিজি মালিকরা তাদের নানা সংকটের কথা তুলে ধরেন। এ ছাড়া বিশ্ব বাজারে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকে দেশের বাজারে এলপিজির দাম বৃদ্ধি আহ্বান জানান। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বিপিসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বৈঠকে বলেনÑ আগে আগে দাম বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এলপিজি আমদানি করা হলে আমদানির মূল্য বিবেচনা করে দাম নির্ধারণ করা হবে। বৈঠকে উপস্থিত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, মার্চে এলপিজি সরবরাহ কোনোভাবে চললেও এপ্রিল বা পরের মাসগুলো এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ নিয়ে সংকট রয়েছে। তিনি বলেনÑ যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় তবে সিরিয়াস সংকটে পড়বে দেশ।
