মুক্তদেশ ডেস্ক:২০২৪ সালে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জেন জেড নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের বাইরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেন মানুষ।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার এই দেশে স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হাসিনাবিরোধী সহিংস আন্দোলনের পর কয়েক মাস অস্থিরতা চলেছে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতও এতে ব্যাহত হয়েছে।
এটি ৩০ বছরের নিচের তরুণদের (জেন জেড) নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর বিশ্বের প্রথম নির্বাচন; আগামী মাসে নেপালেও একই ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছে সাবেক মিত্র দুই দল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। জনমত জরিপে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে রয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট শুরু হওয়ার আগেই ভোটকেন্দ্রের বাইরে লাইনে দাঁড়ান ভোটাররা। তাঁদের মধ্যে ৩৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ জোবায়ের হোসেন বলেন, তিনি সর্বশেষ ২০০৮ সালে ভোট দিয়েছিলেন।
লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “১৭ বছর পর আমরা স্বাধীনভাবে ভোট দিচ্ছি—এটা ভেবে আমি উচ্ছ্বসিত। আমাদের ভোটের মূল্য থাকবে এবং তা অর্থবহ হবে।”
শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ। তিনি দীর্ঘদিনের মিত্র ভারতেই স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন। এতে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কারণ ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।
হাসিনার আমলেও নির্বাচন হয়েছিল, তবে সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, সেগুলো বিরোধী দলের বর্জন ও ভীতি প্রদর্শনের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
এবার জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের জন্য দুই হাজারের বেশি প্রার্থী—যাদের মধ্যে অনেক স্বতন্ত্রও রয়েছেন—প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে ভোট স্থগিত হয়েছে। মোট অন্তত ৫০টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, যা একটি জাতীয় রেকর্ড।
হাসিনার অপসারণের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এই নির্বাচন কেবল আরেকটি নিয়মিত ভোট নয়।”
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে যে গণজাগরণ আমরা দেখেছি, তার সাংবিধানিক প্রকাশ ঘটছে এই নির্বাচনের মাধ্যমে।”
নির্বাচনের পাশাপাশি সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার এবং প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদের সীমা নির্ধারণ।
প্রচারণা পর্বে বড় ধরনের সহিংসতা না ঘটলেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিয়ান বলেন, “বাংলাদেশের জন্য এখন বড় পরীক্ষা হলো নির্বাচনটি ন্যায়সঙ্গত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা এবং সব পক্ষের ফলাফল মেনে নেওয়া। তা হলে এটিই হবে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ।”
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ভোটের দিন সারা দেশে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অধিকাংশ কেন্দ্রের বাইরে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের অবস্থান দেখা গেছে।
সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ভোট
বিকাল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হবে। এরপরই গণনা শুরু হবে। মধ্যরাতের দিকে প্রাথমিক ফলাফল জানা যেতে পারে এবং শুক্রবার সকাল নাগাদ চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।
প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার নিবন্ধিত আছেন, যাদের ৪৯ শতাংশ নারী। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী নারী প্রার্থী মাত্র ৮৩ জন। মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে, যাদের অনেকেই প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন।
ঢাকার উপকণ্ঠে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত অস্থায়ী কেন্দ্রের বাইরে বোরকা পরিহিত নারীদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
৩২ বছর বয়সী গৃহিণী রুমা খাতুন তাঁর হাতে মেহেদিতে আঁকা ‘দাঁড়িপাল্লা’—জামায়াতে ইসলামীর প্রতীক—দেখিয়ে বলেন, “আমি চাই ডা. শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হোন। তিনিই আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন এবং দুর্নীতিমুক্ত ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে পারবেন।”
প্রধানমন্ত্রী পদে প্রধান দুই প্রার্থী হলেন বিএনপির তারেক রহমান ও জামায়াতের শফিকুর রহমান। তাঁদের মধ্যে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই।
কিছু ভোটার অংশগ্রহণ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। রিকশাচালক চান মিয়া বলেন, গ্রামে গিয়ে ভোট দিতে হলে তাঁর দৈনিক আয় বন্ধ হয়ে যাবে। আবার গেটকিপার মোহাম্মদ সবুজ মনে করেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচন নিয়ে তাঁর কিছু হতাশা রয়েছে।
তবে অনেকেই ভোট দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চালক শাকিল আহমেদ বলেন, “হাসিনার আমলে আমরা ভোট দিতে পারিনি। ভোট দেওয়া আমার অধিকার। এবার আমি তা মিস করব না।”
