মুক্তদেশ ডেস্ক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৯ দিন। দেশের সর্বত্র এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তরুণ প্রার্থী। দ্বিতীয়ত, তরুণ ভোটার। রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা এমনটাই মনে করছেন। আসন্ন এ নির্বাচনে দলগুলোর পক্ষ থেকে তরুণ প্রার্থীদের প্রাধান্য দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তারা ইতোপূর্বে বলেছেনÑ এমন প্রার্থী দিতে হবে, যেন তাদের ইমেজ হয় পরিচ্ছন্ন, ব্যক্তিত্ব হয় ধারালো এবং প্রথাগত রাজনৈতিক চর্চার বাইরে বেরিয়ে যেন তারা নতুন স্বপ্ন দেখাতে পারেন এবং তা বাস্তবায়নে দৃঢ়সংকল্প থাকেন। অন্যদিকে, এমন প্রার্থী মাঠে থাকলে তরুণ ভোটাররাও তাদের পক্ষেই রায় দেবেন।
আর তরুণদের রায় এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে নিঃসন্দেহে বড় ভূমিকা রাখবেÑ বলছেন তারা। এ সমীকরণ সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোও অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থীদের গুরুত্ব দিচ্ছে। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের অবস্থান জানান দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যও বলছে, নির্বাচনী মাঠে যেসব তরুণ প্রার্থী আছেন, তাদের অনেকেই এবার চমক দেখাতে পারেন।
এবারের নির্বাচনে লড়াই হবে মূলত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। রাজনীতির নতুন বিন্যাসে তরুণদের ভোট কোনদিকে যাবে, সেটা আগে থেকেই ধারণা করা যাচ্ছে নাÑ বলছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্ত যে জয়-পরাজয়ের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলবে, তা স্বীকার করছে সব দলই। সেই বিবেচনায় রাজনীতির মাঠ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিএনপি এবার দলীয় প্রার্থী নির্ধারণে অগ্রাধিকার দিয়েছে তরুণদের, যেন তারা সহজেই নতুন ভোটার বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোটারের কাছে সহজেই পৌঁছতে সক্ষম হন। বিশেষ করে, রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ঢাকায় তরুণ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়েছে দলটি। শুধু তাই নয়, বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে যারা ভোটের মাঠে লড়ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে তারুণ্যের ভিত্তিতে। উপরন্তু বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে যারা নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন, তাদের একটি বড় অংশই তরুণ। তাদের অনেকেই আবার তরুণ ভোটারের কাছে যোগ্য ও জনপ্রিয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় জোটেও তরুণ প্রার্থীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কেন এমনÑ প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মাসুদ আমাদের সময়কে বলেন, তরুণ প্রজন্ম মূলত তিনটি কারণে জামায়াতে ইসলামীর জোটভুক্ত তরুণ নেতৃত্বে আগ্রহ বেশি দেখাচ্ছে। প্রথমত, তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তন চায়; পরিবর্তিত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে চায়। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় তারা দলীয় ও লেজুড়বৃত্তিমূলক কর্মকাণ্ড পরিহার, দুর্নীতিমুক্ত, ঘুষমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জামায়াতে ইসলামীকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে। তৃতীয়ত, তরুণ প্রজন্ম কিংবা নতুন ভোটাররা জুলাই অভ্যুত্থানের চিন্তা ও আদর্শ বুকে ধারণ করেন। তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে জামায়াতে ইসলামীকে বেছে নিচ্ছে।
নতুন ও তরুণ প্রার্থীদের মধ্যে যাদের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত বেশি তারা হলেন-
পঞ্চগড়-১ ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জমির, নাটোর-১ ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল, সিরাজগঞ্জ-৫ আমিরুল ইসলাম আলিম খান, যশোর-৩ অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, খুলনা-৩ রকিবুল ইসলাম বকুল, ভোলা-৪ নুরুল ইসলাম নয়ন, বরিশাল-৪ রাজীব আহসান, জামালপুর-১ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, শেরপুর-১ সানসিলা জেবরিন, শেরপুর-৩ মাহমুদুল হক রুবেল, ময়মনসিংহ-১০ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু, নেত্রকোণা-১ ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ঢাকা-৪ তানভীর আহমেদ রবিন, ঢাকা-৬ ইশরাক হোসেন, ঢাকা-৯ হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা-১০ শেখ রবিউল আলম রবি, ঢাকা-১১ নাহিদ ইসলাম, ঢাকা-১৩ ববি হাজ্জাজ, ঢাকা-১৪ সানজিদা ইসলাম তুলি, ঢাকা-১৬ আমিনুল হক, ঢাকা-১৮ এসএম জাহাঙ্গীর, গাজীপুর-৪ শাহ রিয়াজুল হান্নান, নারায়ণগঞ্জ-২ নজরুল ইসলাম আজাদ, ফরিদপুর-২ শ্যামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর-৪ শহীদুল ইসলাম বাবুল, গোপালগঞ্জ-১ সেলিমুজ্জামান মোল্ল্যা, গোপালগঞ্জ-৩ এসএম জিলানী, মাদারীপুর-৩ আনিসুর রহমান, শরীয়তপুর-৩ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, সুনামগঞ্জ-১ কামরুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আতাউর রহমান সরকার, কুমিল্লা-৪ হাসনাত আবদুল্লাহ, ফেনী-১ রফিকুল ইসলাম মজনু, নোয়াখালী-৬ মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম-৫ ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল, চট্টগ্রাম-৭ হুম্মম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ সাঈদ আল নোমান, টাঙ্গাইল-৩ এসএম ওবায়দুল হক নাসির, মুন্সীগঞ্জ-৩ কামরুজ্জামান রতন, কিশোরগঞ্জ-৫ সৈয়দ এহসানুল হুদা, পটুয়াখালী-২ শফিকুল ইসলাম মাসুদ, রংপুর-৪ আখতার হোসেন, পটুয়াখালী-৩ নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ রাশেদ খান প্রমুখ।
এ ছাড়া ভোটের মাঠের সমীকরণ পাল্টে দিতে পারেন ঢাকা-৮ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মেঘনা আলম, ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা, ঢাকা-৯ ডা. তাসনিম জারা, নাটোর-১ তাইফুল ইসলাম টিপু, পটুয়াখালী-৩ হাসান মামুন, ঝিনাইদহ-৪ সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, ঢাকা-১২ সাইফুল আলম নীরব, তাসলিমা আখতার, নেত্রকোণা-৪ হেলাল উদ্দিন, জলি তালুকদার, ঢাকা-১৮ আরিফুল ইসলাম আদীব, ঢাকা-১৯ দিলশানা পারভীন, ঢাকা-২০ নাবিলা তাসনিদ, গাজীপুর-৪ মানবেন্দ্র দেব, বরিশাল-৫ ডা. মনীষা চক্রবর্তী, পঞ্চগড়-১ সারজিস আলম, নোয়াখালী-৬ আবদুল হান্নান মাসউদ প্রমুখ।
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর আমাদের সময়কে বলেন, তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের কাছে ভালো সাড়া পাচ্ছি। বিগত স্বৈরাচার সরকারগুলোর শাসনামলে তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস জানতে পারেনি, সরকার জানতে দেয়নি। সবকিছু ছিল ফ্যাসিবাদ সরকার নিয়ন্ত্রিত। পরিবর্তিত সময়ে তারা দেশের সঠিক চিত্র দেখতে পাচ্ছেন। ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে তারা এখন সংঘবদ্ধ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ ভালো আছে। জানি না সামনে কী হবে? সরকারের উচিত, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
গোপালগঞ্জ-১ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন সেলিমুজ্জামান মোল্ল্যা। দৈনিক আমাদের সময়কে তিনি বলেন, গোপালগঞ্জ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ বলা হয়। এ কথার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এখানে স্বাধীনতার পর থেকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ পর্যন্ত অর্থাৎ কোনো জাতীয় নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। তাই নতুন বলেন কিংবা তরুণ ভোটার যাই বলেন না কেন, তারা তাদের পছন্দমতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি, মূলত ভোট দেওয়া লাগেনি। তবে এবার তরুণ ভোটাররাই ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে বেশি উৎসাহিত বলে মনে হচ্ছে।
তরুণ প্রার্থীদের বিষয়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষজন বলছেন, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের ফলই হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যেহেতু ২০২৪ সালের সেই গণ-আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণরাই, যাদের বড় একটি অংশ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন এমনকি তাদের একটি অংশ নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছেন। তাই এবারের নির্বাচন ঘিরে তরুণদের মধ্যে রয়েছে আগ্রহ, উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি প্রত্যাশাও।
তরুণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারা একটি ভিন্ন পরিবেশে নির্বাচন দেখছেন। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোটাররা নানান বিষয় বিবেচনায় আনবে। তারা মনে করছেন, তরুণ ও নীরব ভোটাররাই ব্যবধান গড়ে দেবে। দলীয় প্রার্থী ও সমর্থনের ভোটাররা সরাসরি প্রার্থীদের হয়ে কথা বললেও অধিকাংশ ভোটার কথা বলছে না। কিছুটা বললেও তা ‘ভোট কেন্দ্রে ব্যালটে উত্তর দেব’ বলে মন্তব্য করছে। এমনকি নির্বাচনে বিএনপি-এনসিপির তরুণ প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেও মনে করছেন তারা।
‘দেশটাকে ভালোবাসি। এ কারণে ভোট দিতে যাব। সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেব।’ Ñবললেন এবার প্রথম ভোটার হওয়া তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মামুন। তরুণ নেতৃত্ব বেছে নিতেই তিনি ভোট দিতে যেতে ইচ্ছুক বলে জানান।
ময়নমনসিংহ-১০ আসন থেকে বিএনপির ধানের শীষ প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চু আমাদের সময়কে বলেন, নতুন প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী। তারা তারুণ্যে নির্ভর নেতৃত্ব পছন্দ করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। তারা প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়; সম্ভাবনার রাজনীতি দেখতে চান। তারা চান মাদকমুক্ত দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রেজায়ে রাব্বি জায়েদ আমাদের সময়কে বলেন, মানুষ একটা পরিবর্তন চাইছেন। তরুণদের বিশ্বাস করে এবার ভোটাররা ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীকে ভোট দেবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। প্রাণপণ চেষ্টা করছি ডোর টু ডোর মানুষের কাছে পৌঁছাতে। তরুণ ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। প্রচারণায় উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। যদিও ঢাকা-৮ এবং ঢাকা-১৮ আসন থেকে ১১ দলীয় প্রার্থীদের প্রচারণায় বাধা দেওয়া হয়, হামলার শিকার হন তারা। কিন্তু সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তাই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলা যায় না। বরং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে আমাদের শঙ্কায় আছে। তারপরও আশা করি ১২ তারিখ তরুণ প্রার্থীরা ভালো করবেন এবং তরুণ ভোটাররাই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবেন।
রাজধানীর মালিবাগ বসবাসরত মোহম্মদপুর সরকারি কলেজ শিক্ষার্থী মাহির হোসেন আলভী আমাদের সময়কে বলেন, পরিবর্তন আসুক ভোটে। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তরুণ প্রার্থীদের সবদিক বিবেচনা করব। এবার যেহেতু একটা ভোটিং কালচার আমরা পাচ্ছি, আমি মনে করি তরুণদের এখানে সক্রিয়ভাবে ভোটে অংশ নেওয়া উচিত।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার ৪ কোটি ৩২ লাখ প্রায়। অর্থাৎ, মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ।
