মুক্তদেশ ডেস্ক:জীবনের প্রথম দিন স্কুলে যাওয়ার আনন্দে চোখ দুটো ঝলমল করছিল সাত বছরের শিশু জুনায়েদের। সকাল ঠিক ৯টায় নতুন স্কুল ড্রেস পরে মায়ের হাত ধরে স্কুলের পথে পা বাড়ায় সে। যাওয়ার পথে শিশুসুলভ আবদারে মায়ের কাছে চকোলেট চায়—মা হাসিমুখে কিনেও দেন। কে জানত, সেই হাসি আর উচ্ছ্বাসই অল্প সময়ের মধ্যেই পরিণত হবে অসীম শোকে।
প্রথম দিনের ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ তৃষ্ণা পায় জুনায়েদের। কাউকে কিছু না জানিয়ে নিঃশব্দে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যায় সে। স্কুলের পাশেই ছিল একটি মসজিদের টিউবওয়েল। সেখানে পানি তুলতে গিয়ে ভারী হ্যান্ডেল চাপার সময় পা পিছলে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই সে পড়ে যায় পাশের গভীর, খোলা পানিভর্তি ট্যাংকিতে। আর সেখান থেকেই আর উঠে আসতে পারেনি ছোট্ট জুনায়েদ—খেলাঘরের বয়সেই তার জীবনের সব গল্প থেমে যায় পানির নিচে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের সোনামুই বাজারসংলগ্ন একটি প্রিক্যাডেট স্কুল প্রাঙ্গণে ঘটে হৃদয়বিদারক এই দুর্ঘটনা। খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় নেমে আসে শোকের গভীর ছায়া। স্কুল প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নিস্তব্ধতা আর কান্নার শব্দ।
নিহত জুনায়েদ ভাদাই গ্রামের শফিকুল ইসলাম ও ছন্দা খাতুনের একমাত্র সন্তান। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে মানুষ করার, বইখাতায় ভরিয়ে দেওয়ার শৈশব—সব স্বপ্ন এক নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাকিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সবার অগোচরে জুনায়েদ ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। টিউবওয়েল চাপতে গিয়ে পা পিছলে সে পাশের ট্যাংকিতে পড়ে যায়। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর তাকে না পেয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। প্রায় আট ঘণ্টা পর সেই ট্যাংকিতেই ভেসে ওঠে জুনায়েদের নিথর দেহ।
সন্তান হারিয়ে বাবা-মায়ের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন,
“ভোর হতেই স্কুলে যাওয়ার বায়না ধরেছিল আমার ছেলে। চোখে ছিল কত আনন্দ, কত স্বপ্ন। বুঝিনি—ওটাই হবে আমার ছেলের জীবনের শেষ বায়না।”
স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, ওই খোলা ট্যাংকিতে আগেও দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবহেলার সেই নীরবতার বলি হলো আরেকটি নিষ্পাপ প্রাণ।
একদিনের স্কুলযাত্রা—আর ফিরে এলো নিথর দেহে। জুনায়েদের গল্প শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার নির্মম দলিল।
