১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, মূল তিন আসামি ভারতে পলাতক
মুক্তদেশ ডেস্ক:ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার ঘটনায় তদন্ত শেষে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঘটনার ২৪ দিনের মাথায় মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
মঙ্গলবার বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।
হত্যার কারণ ও পরিকল্পনা
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, শরিফ ওসমান হাদি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করতেন। তাঁর এসব বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু নেতা-কর্মী।
এই ক্ষোভ থেকেই তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
তদন্ত অনুযায়ী, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী (বাপ্পী)।
যেভাবে হত্যা করা হয়
গত ১২ ডিসেম্বর, জুমার নামাজের কিছু পর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশায় বসা অবস্থায় শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। মোটরসাইকেলে এসে তাঁর মাথায় গুলি চালিয়ে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়।
এই হামলায় সরাসরি গুলি করেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম ওরফে মাসুদ। মোটরসাইকেলটি চালান আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন (২৬)।
গুরুতর আহত অবস্থায় ওসমান হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
পলাতক মূল আসামিরা
হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিনজন—
- তাইজুল ইসলাম চৌধুরী (বাপ্পী),
- ফয়সাল করিম মাসুদ,
- আলমগীর হোসেন—
এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ডিবির তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা ভারতে পালিয়ে গেছেন।
এ ছাড়া পলাতক আরও দুজন হলেন—
- ফয়সালের ভগ্নিপতি মুক্তি মাহমুদ (৫১), যিনি অস্ত্র সংরক্ষণ ও আশ্রয় দেন,
- হালুয়াঘাট সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ফিলিপ স্নাল (৩২), যিনি সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেন।
গ্রেপ্তার ১২ জন, কার কী ভূমিকা
এ মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী—
- কেউ হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল সরবরাহ করেছেন,
- কেউ অস্ত্র সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও স্থানান্তরে যুক্ত ছিলেন,
- কেউ অর্থ সহায়তা দিয়েছেন,
- কেউ পালিয়ে যেতে আশ্রয় ও লজিস্টিক সহায়তা করেছেন।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে ফয়সাল করিমের বাবা-মা, স্ত্রী, বোন, শ্যালক এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও রয়েছেন।
ফয়সালের ভিডিও বার্তা নিয়ে ডিবির বক্তব্য
সম্প্রতি ফয়সাল করিম কয়েকটি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হচ্ছে এবং তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
এ বিষয়ে ডিবিপ্রধান বলেন, ভিডিওগুলো পর্যালোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং ভিডিওগুলো ফয়সালেরই বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল দুবাইয়ে নয়, ভারতে অবস্থান করছেন।
পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় পলাতক আসামিদের ফেরত আনা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান জানান, আদালতে অভিযোগ গঠন শেষে আইনগত সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
সম্পূরক অভিযোগপত্রের সুযোগ
ডিবি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন তথ্য বা নতুন কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
