মুক্তদেশ:
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সরিয়ে নেওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্র এখন নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের হাতে। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট অনুপস্থিত থাকলে ভাইস প্রেসিডেন্টই ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। সে অনুযায়ী এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ডেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট। সূত্র :সিএনএন
গত শনিবার বিকেলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি অর্থমন্ত্রী ও তেলমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ডেলসি জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের জরুরি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে তিনি মাদুরো দম্পতির ‘অবিলম্বে মুক্তি’ দাবি করেন এবং ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের তীব্র নিন্দা জানান।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে ডেলসি বলেন, এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ও দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হামলা। তিনি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সরকার ও ভেনেজুয়েলার জনগণকে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
কে এই ডেলসি রদ্রিগেজ
৫৬ বছর বয়সী ডেলসি রদ্রিগেজের জন্ম রাজধানী কারাকাসে। তিনি ভেনেজুয়েলার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ‘চাভিজমো’ রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। এই আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ, যার নেতৃত্বে পরে ছিলেন নিকোলা মাদুরো।
ডেলসির ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ বর্তমানে দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট। চাভেজ আমল থেকেই দুই ভাইবোন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ডেলসি ২০১৩–১৪ সালে তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী এবং ২০১৪–১৭ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ তুলে ধরেন।
২০১৭ সালে তিনি কনস্টিটিউয়েন্ট ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৮ সালে মাদুরো তাঁকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া মাদুরোর তৃতীয় মেয়াদেও তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। মাদুরো আটক হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক কর্তৃপক্ষ ও তেলমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে
মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কথা বলেছেন। ট্রাম্প বলেন, ডেলসি ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলে মনে হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা এ বক্তব্যে বিস্মিত। তাঁদের মতে, ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নমনীয় হবেন—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। জ্যাক ডি. গর্ডন ইনস্টিটিউটের পলিসি অ্যানালিস্ট ও ভেনেজুয়েলায় তুরস্কের সাবেক কূটনীতিক ইমদাত ওনার বলেন, ডেলসি মাদুরোর কোনো উদারপন্থী বিকল্প নন। বরং তিনি ব্যবস্থার ভেতরের সবচেয়ে শক্ত ও কট্টর নেতাদের একজন।
অন্য এক বিশ্লেষক হোসে ম্যানুয়েল রোমানো বলেন, ডেলসি একজন দক্ষ প্রশাসক এবং পুরো সরকারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মাদুরো তাঁকে পূর্ণ আস্থা দিতেন।
কঠোর অবস্থানেই ডেলসি
মাদুরো আটক হওয়ার পর দেওয়া প্রথম বক্তব্যগুলোতেই ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত দেননি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী কোথায় আছেন, তা তিনি জানেন না, তবে তাঁদের জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করেন।
পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের বৈঠকে তিনি আরও কঠোর ভাষায় মার্কিন অভিযানের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যেমনই হোক, ভেনেজুয়েলার প্রকৃত প্রেসিডেন্ট হলেন নিকোলা মাদুরো।
ডেলসি রদ্রিগেজ স্পষ্ট করে ঘোষণা দেন,
“এই দেশে একজনই প্রেসিডেন্ট আছেন, আর তাঁর নাম নিকোলা মাদুরো মোরোস।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তবে আপাতত দেশটির ক্ষমতার মুখ হিসেবে ডেলসি রদ্রিগেজই সামনে, এবং তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো নমনীয়তার আভাস দেখা যাচ্ছে না।
