মু. হাসান শাহ্রিয়ার:
রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ পূর্ব প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে আন্তর্জাতিক ইসলামি বইমেলা-২০২৫। এবারের মেলা দেশি-বিদেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে পেয়েছে নতুন মাত্রা। এ মেলার উদ্বোধন করেন ধর্ম উপদেষ্টা আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা এবং ছুটির দিনে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা চলে। মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন প্রকাশনী ২০ থেকে ৬০ শতাংশ বিশেষ ডিসকাউন্ট দিচ্ছে। ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই মেলা গতকাল ১২ অক্টোবর রবিবার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আরও এক সপ্তাহ বাড়ল সময়। অর্থাৎ আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে এই আন্তর্জাতিক ইসলামি বইমেলা । গতকাল এ সংত্রান্ত ঘোষণা দেয় কতৃপক্ষ।
আয়োজক সূত্র জানিয়েছে, এবার মেলায় ১৫০টি প্রকাশনীর স্টল রয়েছে। এতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, দেশের স্বনামধন্য ইসলামি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, ঢাকার বাইরে থেকে আসা রাজশাহীর তিনটি এবং চট্টগ্রামের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও মিশর, লেবানন ও পাকিস্তানের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও অংশ নিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বইমেলা আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। মেলায় কোরআন, হাদিস, তাফসির, ইসলামি ইতিহাস, সাহিত্য, শিশুতোষ গল্প এবং আধুনিক গবেষণাধর্মী বইসহ নানা ধরনের প্রকাশনা প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে। বইপ্রেমীদের জন্য রয়েছে আলাদা পাঠকোণ এবং ইসলামি ক্যালিগ্রাফি ও ডিজিটাল প্রকাশনার প্রদর্শনী। আরও রয়েছে লিটল ম্যাগ কর্নার। সব মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় সংগ্রহের পসরা সেজেছে এ মেলায়। প্রতিদিনই নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, লেখক-পাঠক আড্ডা, ক্বিরাত ও হামদ-নাত পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আয়োজন করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন স্পন্সরে মুসান্নিফ গ্রুপ। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে মেলা শুরু হলেও দুপুরের পর থেকে মেলায় ভিড় বাড়ছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোয় থাকছে উপচে পড়া ভিড়। মেলায় ভিড় জমাচ্ছেন শিক্ষার্থী, পরিবার-পরিজন এবং সাধারণ পাঠক। কেউ বই কিনছেন, কেউ প্রিয় লেখকের সঙ্গে দেখা করছেন, আবার কেউ অংশ নিচ্ছেন আলোচনাসভা ও সেমিনারে। মেলা প্রাঙ্গণে রয়েছে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি পানের ব্যবস্থা।
একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বই মূলত আরববি, উদু ও ইংরেজি। বইগুলো মূলত তাফসির ও ফেকাহ শাস্ত্রের। মেলায় অংশ নেওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এ পর্যন্ত এক কোটি টাকারও বেশি বই অর্ডার পেয়েছে। দেশের বড় মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এর মূল ক্রেতা।
মাকতাবাতুল আযহারের কর্ণধার ওবাইদুল্লাহ জানান, বরাবরের মতো এবারও মূলধারার মিডিয়াগুলোয় এই আন্তর্জাতিক বই মেলার প্রচার কম। একুশে বইমেলার অর্ধেক কাভারেজও যদি এই মেলা পেত তাহলে মুসলিম উম্মারও কল্যাণ হতো। সেই সঙ্গে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান, সময় কাটানো ও বিনোদনের জন্য বইয়ের কাছে ফিরে যাই। মোবাইল আসক্তির মহামারী থেকে নিজেদের ও নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করি।
রাজধানীর শেখেরটেক থেকে মেলায় আসা ফয়সাল আজিজ, বালুরঘাট থেকে আসা জেমী রশীদ, পুরান ঢাকা থেকে আসা খাইরুল আলমসহ মেলায় আগত অধিাকাংশ মানুষের আক্ষেপ, ইসলামি বইমেলা উপলক্ষে মানুষের মাঝে যে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও প্রচার-প্রচারণা থাকার কথা ছিল, তা একেবারেই অনুপস্থিত। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের মিডিয়া ও সরকারের প্রতি সুদৃষ্টি কামনা করেন তারা।
লেখক কর্নার : মেলার গেটের ভিতরে ও বাইরে দুটি লেখক কর্ণার রয়েছে। লেখক ও প্রকাশকগণ এখানে বসে সময় কাটান ও পাঠকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
রাহনুমা প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আবু সুফিয়ান জানান, তাদের প্রকাশনীর বয়স ১৩ বছর। মূলত ইসলামি ভাবধারার ফিকশনধর্মী বই বেশি প্রকাশ করেন তারা। তা ছাড়াও রয়েছে সামাজিক উপন্যাস, অ্যাডভেঞ্চার, ভ্রমণকাহিনি মিলিয়ে দুই শতাধিক বই। তিনি আহ্বান জানান, এই মেলা সুস্থ মানসিকতা বিকাশের, তাই আপনিও শামিল হোন। বই কিনুন, বই পড়ুন, বই উপহার দিন।
ইসলামিক ল রিসার্চ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড নামের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি ইসলামি আইন, ফিকাহ ও গবেষণাভিত্তিক বই প্রকাশ করে। তাদের বিপণন ব্যবস্থাপক সরাফত খান জানিয়েছেন, তারা একটি মাসিক সাময়িকীও প্রকাশ করে ইসলামি আইন বিষয়ে।
আয-যিহান পাবলিকেশনের খাইরুল ইসলাম বলেন, আমরা নিজেদের উদ্যোগেই এ মেলাটিকে প্রাণবন্ত ও সফল করার জন্য এগিয়ে আসি। আমরা ভালো বই কিনে লেখক ও প্রকাশকদের উৎসাহিত করি এবং প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহযোগিতা করি।
এ পর্যন্ত মেলায় আসা উল্লেখযোগ্য নতুন বই : মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীনের লেখা ‘আমাদের নবীজি’ বইটি প্রকাশ করেছে মেশক প্রকাশন; ইলহাম এনেছে আমিনুল ইসলাম হুসাইনীর ‘আম্মু বলেছেন’, ইফতেখার সিফাতের ‘শেষ সিজদা’ প্রকাশ করেছে সিজদাহ পাবলিকেশন; প্রফেসর ড. ইন্জিনিয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলমর ‘লাইফ এন্ড টাইম ম্যানেজমেন্ট’ এনেছে গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স; এনামুল করীম ইমামের ‘তুলাইহার তাওবা’ প্রকাশ করেছে মুহাম্মদ পাবলিকেশন; আবদুর রশীদ তারাপাশীর ভাষান্তরে ‘আর রাহিকুল মাখতুম ’ এনেছে কালান্তর প্রকাশনী; এ ছাড়াও কালান্তর প্রকাশনী এনেছে বেশ কিছু ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন। আবদুল্লাহ বিন বশিরের ‘ইসলাম ও পশ্চিম সভ্যতা’ এনেছে চেতনা প্রকাশন; মুফতি তামজিদুল মাওলা কাসেমির অনূদিত ‘সেজদায় যাদের মরণ এলো’ প্রকাশিত হয়েছে পুনরায় প্রকাশনী থেকে; আবদুল করীম নোমানীর ‘বনি ইসরাইল থেকে আজকের ইহুদি’ প্রকাশ করেছে প্রয়াস প্রকাশন, ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহর লেখা ‘আল ফাওয়াইদ’ এনেছে সমকালীন পকাশন; সদরুল আমীন সাকিবের ‘ইসলামের চারিত্রিক ইতিহাস’ প্রাকাশ করেছে ইত্তিহাদ পাবলিকেশন; ড. মুবাশ্বির হুসাইন রাহমানীর ‘কছু কথা কিছু সতর্কতা প্রকাশ করেছে নাশাত পাবলিকেশন; মাওলানা ইসমাইল হোসাইনের ‘চরিত্র সংশোধন’ এনেছে ইহদা পাবলিকেশন, খুররম জাহ মুরাদের ‘নিজের সংশোধন নিজে’ প্রকাশ করেছে রিফাইন পাবলিকেশন; ড. মুহাম্মদ মূসা আশ শরিফের ‘বয়স যখন চল্লিশে’ প্রকাশিত হয়েছে সুকুন পাবলিশিং থেকে, আবু সুফিয়ানের ‘ড্রাক ডকট্রিন’ প্রকাশ করেছে সিয়ান পাবিলিকেশন; নাবিল হামিদ আল মুআযের ‘নবীজির প্রতি ভালোবাসা’ এনেছে পেনফিল্ড পাবিলিকেশন; আহমাদ রিফআতের লেখা ‘কমনসে’ প্রকাশ করেছে আকীল পাবলিকেশন; মাওলানা ইসমাইল হোসাইনের ‘চরিত্র সংশোধন’ এনেছে ইহদা পাবলিকেশন; রাহিল আব্দুর রহমানের ‘এ সময় কেটে যাবে’ প্রকাশিত হযেছেÑ সাবাহ পাবলিকেশন থেকে; সাদ আহমাদের ‘ভিন্নমত’ প্রকাশ করেছে নবপ্রকাশ ।
কিডস কর্নার : বায়তুল মোকাররমের পূর্ব গেটের বাইরে বাচ্চাদের খেলার জন্য রয়েছে একটি কিডস কর্নার। ছোট বাচ্চারা এখানে বিভিন্ন রাইডে চড়ে আনন্দ উপভোগ করতে পারছে। ঢেঁকি রাইড, স্লিপার, দোল খাওয়ার জন্য ঘোড়ার রাইডসহ কয়েকটি খেলনার আইটেম রয়েছে। কিডস কর্নারের রাইডগুলো বাচ্চাদের জন্য একদম ফ্রি!
ফিমেল কর্নার : মা-বোনদের নামাজ ও বিশ্রামের জন্য রয়েছে ২টি ফিমেল কর্নার। একটি গেট দিয়ে ঢুকে ওপরে মসজিদের অংশে। অপরটি গেটের বাইরে পূর্ব দিকে কিডস কর্নারের পাশে। ফিমেল কর্নারে নারীরা বসে বিশ্রাম করতে পারবেন। নামাজ পড়তে পারবেন। ছোট বাচ্চা নিয়ে গেলে তাদেরকে টেককেয়ার করতে পারবেন।
খাবারের ব্যবস্থা : মেলা প্রাঙ্গণে ‘বৈঠকখানা’ নামে দুটি খাবারের স্টল রয়েছে। একটি মসজিদের গেট সংলগ্ন ওপরে উত্তর পাশে লেখক কর্নারের ভেতরে, অন্যটি পূর্ব দিকের কিডস কর্নারের আগে।
সব কিছুর পরও মেলার আয়োজকদের আশা, এ আয়োজন তরুণ প্রজন্মকে ইসলামি আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে। আন্তর্জাতিক ইসলামি বইমেলা ২০২৫ হয়ে উঠেছে জ্ঞান, সংস্কৃতি ও প্রেরণার এক মিলনমেলা।
