এম. হাসান
লক্ষ্য নির্ধারণ সংক্রান্ত বেশিরভাগ লেখার একটি সাধারণ বিষয় হলো, আপনার আবেগ বা আগ্রহ অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা। সেই কাজগুলো করুন, যা আপনাকে সকালে তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে উৎসাহিত করে। তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় যদি আপনার কোনো প্যাশন বা গভীর আগ্রহই না থাকে?
আমি নিশ্চিত, পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের কিছু না কিছু আগ্রহ থাকে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। ভিডিও গেম খেলে আনন্দ পাওয়া এক জিনিস, আর নিজের গেম তৈরি করতে হাজার হাজার ঘণ্টা ব্যয় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনার আসল আবেগ হতে হবে এমন কিছু, যার জন্য আপনি অসাধারণভাবে কঠোর পরিশ্রম করতে রাজি হবেন।
তাহলে আপনি কী করবেন, যদি এমন কিছুই না থাকে যা আপনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়?
শুরু করার সঠিক উপায় কোনো সার্ভে নয়। অনেক ক্যারিয়ার পরামর্শদাতা আপনার বর্তমান দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ করে বলে দেয়, কোন কাজ আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
অধিাকাংশ ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সঠিক ফল দেয়। কারণ মানুষ জটিল। এবং যেকোনো টেস্ট বা প্রশ্নমালা শেষমেশ আপনার পছন্দ-অপছন্দ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একধরনের স্থূল সরলীকরণ। এক ধনী মহিলা স্বামী খুঁজছিলেন। তিনি দুই লাখ টাকা ব্যয় করে একাধিক মনোবৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করলেন, যেখানে মনের গঠন, রুচি, চরিত্র অনুযায়ী তার জন্য ‘সেরা পাত্রদের’ তালিকা তৈরি হলো। তিনি সেই পাত্রদের একে একে দেখা করলেন।
কাউকে ভালো লাগল না। কয়েক মাস পর, তিনি বিয়ে করলেন এক লোককে, যাকে তিনি হঠাৎ এক বারে দেখে পছন্দ করে ফেলেছিলেন।
শিক্ষা: আপনি অনেক সময় জানেন না আপনি কী চান Ñ যতক্ষণ না সেটার বাস্তব রূপ দেখেন। কোনো প্রশ্নমালাই সেই উত্তর দিতে পারে না।
বাস্তবতা হলো, কোনো প্রশ্নমালা আপনাকে বলতে পারবে আপনি কী নিয়ে সত্যিই আগ্রহী হয়ে উঠবেন। আমি বরং বিচিত্র সব জিনিস পরীক্ষা করব Ñ একটা টেস্ট বলেছে আমি এটা পছন্দ করব না বলে আমি নিজেকে সীমাবদ্ধ করব না।
কীভাবে নিজের আবেগ খুঁজে পাবেন :
আসলে আপনার আগ্রহ খুঁজে পাওয়ার ভালো পদ্ধতি বেশ সহজ। অনেক ভিন্নধর্মী জিনিস চেষ্টা করুন। দেখুন আপনি কোনটা উপভোগ করেন। এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, আপনি নিজেই ভাবেন আপনি কী করতে পারবেন Ñ সেই কল্পনার সীমাবদ্ধতা।
যদি অপনি কিছুতেই আগ্রহী না হন, তাহলে আপনি চেষ্টা করুন আপনার সীমার বাইরে গিয়ে একাধিক ভিন্নধর্মী কাজ করতে। পরিচিত আর নিরাপদ জিনিসে আটকে থাকাটাই বোরড হওয়ার কারণ। এখনই সময় নতুন কিছু চেষ্টা করার।
‘ড্যাবলিং’ (উধননষরহম) Ñ অর্থাৎ অল্প সময়ের জন্য নতুন কিছু শেখা বা অনুশীলন করা এটি আবেগ খুঁজে পাওয়ার শিল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
ড্যাবলিং মানে হলো ৩ থেকে ৬ মাসের জন্য কোনো কিছুর প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করা। এই সময়টুকুতে আপনি কোনো বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হতে পারবেন না। তবে শুরুর সেই কঠিন শেখার ধাপটা পার হওয়ার জন্য এটা যথেষ্ট সময়।
এক বিশ্ববিখ্যাত কম্প্রিউটার তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এভাবেÑ ‘আমি যখন প্রথম প্রোগ্রামিং শুরু করি, তখন কয়েক মাস একদম উপভোগ করতাম না। আমি পর্যাপ্ত জানতাম না, আর এত হতাশাজনক ছিল যে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু একবার সেই হতাশার দেয়াল পার হয়ে গেলে, আমি আবিষ্কার করলাম প্রোগ্রামিং আমি সত্যিই উপভোগ করি।’ বাকিটা সাফল্যের ইতিহাস।
তাই বলি কীÑআপনার যদি এমন কোনো প্রকল্প না থাকে যেটা নিয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়তে ইচ্ছা করে, তাহলে আপনাকে ড্যাবলিং শুরু করতে হবে। নিজের আরামদায়ক পরিধির বাইরে গিয়ে এমন কিছু খুঁজুন যা আপনি সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা করে করতে পারেন এবং অন্তত দুই মাসের জন্য করুন। মাঝে মাঝে দরকার হয় একটুখানি ‘স্পার্ক’। কখনো কখনো সমস্যা কাজটা নয়, বরং লক্ষ্যটা। ছোট ছোট নিজের তৈরি করা প্রকল্পে কাজ করতে উপভোগ করুন। কিন্তু যখন আপনি দেখবেন যে মানুষ নিজের সেই প্রকল্পগুলো থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবসা দাঁড় করাচ্ছে সেদিন আপনি সত্যিই আগ্রহী হয়ে উঠবেন। তার পরে,আপনি বুঝতে পারবেন Ñ সেখানে এমন একটা চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য আছে, যা আমি আগে কল্পনাও কনেনি। তাই বিভিন্ন ধরনের কাজের মতোই, বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যেও ড্যাবল করা জরুরি। অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন।
আপনার বুকশেলফে সাধারণত যে বই থাকে না এমন কিছু পড়ুন। এই ধরনের ‘র্যান্ডমনেস’ বা এলোমেলোতা সেই সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় Ñযাতে আপনার কোনো নিরীহ আগ্রহ হঠাৎ করে কোনো গভীর আবেগে রূপ নিতে পারে। সবসময় খুঁজে যান আরও কিছু। ড্যাবলিং হলো একটানা চলতে থাকা একটি প্রক্রিয়া। একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিজেকে উৎসর্গ করা ভালো — কিন্তু তার মাঝেও ছোট ছোট নতুন জিনিস চেষ্টা করার জায়গা থাকা উচিত। যদি আপনি সবসময় ড্যাবল করতে থাকেন, তাহলে আপনার হাতে এমন এক বিশাল আগ্রহের ভাণ্ডার থাকবে, যেখান থেকে আপনি মজার ও অর্থবহ কাজ বেছে নিতে পারবেন। বোরড হওয়াকে কখনো সহ্য করবেন না।
